বুলি আর ভাষার মধ্যে পার্থক্য আছে। বুলিরা বয়ে চলা নদীর মতো। – কখনো গভীর; তো কখনো প্রশস্ত। কখনো জলে টম্বুর তো কখনো শুকোনো। কোথাও আছে, কোথাও আবার হারিয়ে যাওয়ার নেশায় পেয়ে বসেছে তাকে।
ভাষারা অবশ্য তেমনটা নয়। প্রশস্তিতে সে কেবল সন্তুষ্ট নয়, ড্রেজিং করে খাত গভীর থেকে গভীরতর করাতেই তার আনন্দ। ভার না হলে তার চলে না। বুলিরা স-ক্ষম। ভাষারা ক্ষম-তা-বান।
===
বহুভাষিক ভারতে ক্ষমতায়ন ও স্বীকৃতির প্রসঙ্গটি সহজ বোধ্য নয়। যতো ভাষা, তার থেকে অনেকগুণ বেশি বুলি। নামহীন পরিচয়হীন সহাবস্থানে বুলিদের সেই জগত আন্তরিক। ক্ষমতা শব্দটি সেখানে অন্তরের ভাব, সামর্থ্য, বা যোগ্যতা অর্থে বিবেচ্য। ইংরেজিতে বলতে গেলে inner nature আর সংস্কৃতে তদ্ভাব মানে তার ভাব-এর সাথে তুলনীয়। বাইরের আস্ফালন বা আড়ম্বরে তার ভারি বয়েই গেছে। বাহুল্যর আকাঙ্ক্ষা তাকে গ্রাস করে নি বলেই ক্ষমতা মানে power-এর সাথে খুব একটা সখ্যতা গড়ে ওঠে নি। ক্ষমতার বৃত্তে ঢোকার তাগিদে কুলজি ঠিকুজি নিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকার দায় তার নেই।
===
বহুভাষিক ভারতটা বুলিদের নয়। বুলিদের জগতটা এখনও ভাদু, টুসু, ইতুর। পাকুড়, শ্যাওড়া, ডুমুরের। এদের কার্নিভাল বা ব্যালকনি বাগিচার পিটুনিয়া ক্যালেন্ডুলা হয়ে উঠতে এখনও আরো খানিকটা বাকি আছে বলেই মনে হয়। বুলিদের ভাসা বুলিদের বাঁচা রোরো কাঞ্চি ডুলুং রংপোকে কেন্দ্র করে। নাগরিক চোখে ধরাই পড়ে না প্রায়।
===
ক্ষমতায়ন মানে কি সাম্য? যে ক্ষমতা বাইরের আস্ফালনকে তোল্লাই দেয় – আত্মগরিমায় নিজেকেই নিজে মহিমান্বিত করে তোলে – তাকে দিয়ে একটা সমান ব্যবস্থার আয়োজন করা আদৌ যাবে কি? ক্ষমতায়ন সাধারণত সহাবস্থানে অন্তর্লীন সামাজিক সামঞ্জস্যের ধারণাটিকে নস্যাৎ ক'রে, অসাম্যকেই এনে হাজির করে। সহযোগীদের গল্পগাছাগুলোকে মুড়িয়ে টিকিয়ে রাখে কেবল প্রতিযোগীদের 'কারনামা’।
===
বুলির স্বীকৃতি বুলির ব্যবহারকারীদের কাছে থাকলেও, ভাষার স্বীকৃতি একটা সরকারি ব্যাপার। তা নিয়ে বিস্তর কাঠখড় পড়ানোর ব্যাপার স্যাপার রয়েছে। বুলিকে তার দৈনিক বাঁচামরার ঊর্ধ্বে তুলে না ধরতে পারলে – তার ভাষা রূপে স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ভাষারা নিত্য। যারা সমকালীন তারা কথনের ইতিহাস ভূগোল গায়ে মেখে বুলি হয়ে রয়ে গেছে বলেই অনিত্য। বাকি গুটিকয় দেশ কালের গণ্ডি অতিক্রম করেছে বলেই নিত্য – সেইজন্যেই ভাষা।
ঠিক যেমন পাথর কেটে মূর্তি বানানোর জন্যে ছেনি হাতুড়ি লাগে, ঠিক তেমনই বুলির ছাঁটকাটে লাগে সাহিত্য, ব্যাকরণ, অনুবাদ, লিপি। তবেই তা ক্ষমতার বৃত্তে অন্যদের প্রতিযোগী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
===
বহু স্বর যদি বাস্তবতা হয় তাহলে ভাষা নিশ্চিত ভাবেই নির্মাণ। বুলি যদি প্রাকৃত হয়, ভাষা নিশ্চিত ভাবেই সংস্কৃত। সংস্কার করা নিত্য ভাষারূপগুলির স্বীকৃতি ও তাদের মধ্যেকার power অর্থে ক্ষমতার সমীকরণের মূলে যে শিষ্টায়ন প্রক্রিয়া সেটি আবার ইতিহাস-ভূগোলের রাজনৈতিক স্মৃতি ও সংস্কৃতির আয়তনে ধরে রাখা বিদ্যে সাপেক্ষ একটা বিষয়।
===
বছর বছর স্টক চেক করতে ফান্ড নিয়ে ভাষাদের তাই ম্যানেজারি করতেই হয়…
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।