ক্রমশ বাসে ভীড় বাড়ে, ফের কমে, আবার বাড়ে। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা কমে যায়, ফের লাস্ট স্টপ, সেই ভার্না রেল স্টেশন। যেখানে আমি সমুদ্রের গন্ধ পেয়েছিলাম আজ সকালে। এখন অবশ্য রেল স্টেশনের গন্ধও পাচ্ছি। এই অদ্ভুত রকমের গন্ধ পাবার ব্যাপারটা আজ পর্যন্ত কারওকে বোঝানো সম্ভব হলো না। কারণ এই গন্ধগুলোর সঙ্গে মিল আছে এমন কোনও জিনিস আমার চেনা নেই।বাবু একটু ভদ্রতা করে বলল, আপনি আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করবেন প্লিজ।
উনি তৎক্ষণাৎ রাজি। আমরা সমুদ্রের দিকে যাবার পথে দেখি বেশ কয়েকটা রেস্টুরেন্ট রয়েছে, আমাদের কোনও বাছবিচার নেই, কিন্তু ওঁর কোনওটাই পছন্দ হয় না, ওঁর পছন্দের খাবার সেই রেস্টুরেন্টগুলোয় পাওয়া গেল না।
মিনিট দশেক হাঁটার পরেই ডানদিকে তাকালেই দেখা গেল সমুদ্র সৈকত, একেবারে গা ঘেঁষে চমৎকার একটা দোতলে রেস্টুরেন্ট যেটার অধিকাংশই ওপেন এয়ার, এবং ফাইনালি এখানে ঐ মহিলার পছন্দের খাবার পাওয়া যায়।
এর চেয়ে ভালো আর কীই বা হতে পারে?
চমৎকার সব স্টেক, নানান রকমের বিয়ার, প্রায় দশ রকমের স্যালাদ, যেটা পছন্দ সেটাই নেওয়া যাবে। প্রায় আড়াইটে বাজতে চলল। উনি নিলেন একবাটি মাছের সুপ। ঐটি ওঁর সেই বিশেষ পছন্দের খাবার।
বড়োজোর কুড়ি মিটার দূরে সমুদ্র। খেতে দেখছি বীচে বেশ কয়েকজন রোদ পোয়ায়, জলেও অনেকে, প্রচুর পাখিও রয়েছে, মোটকথা সমুদ্রকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আজ সেসব হবার নয়।
ঐ মহিলাটি কীসব যেন নিজের মনে ভাবেন। আমরা তো অনর্গল গল্প করে চলেছি, কিন্তু সেসব কথার মধ্যেই তিনি কেমন যেন অন্যমনস্ক।
হঠাৎ হঠাৎই এমন দুয়েকটা কথা বলে ফেলেন যেটা শুনলে কেউ হয়তো ভাববে মেয়েটার মাথায় একটু ছিট আছে।
তবে আমি জানি, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে, যে চাকরির সন্ধানে যখন হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়, তখন এমন সব চিন্তা মাথায় ঘোরে, যে সব সময়ে সামাজিকতা রক্ষা করে কথা বলতে মানুষ ভুলে যায়।
আসলে বুলগারিয়ায় একজন আনএম্পলয়েড মধ্যবয়সী কিন্ডারগার্টেন শিক্ষিকা — এই ব্যাপারটাই হয়ত এখন থেকে তিরিশ বছর আগে অবান্তর ছিল, কিন্তু এখন সেটা বাস্তব।
টুকটাক খাবার কিছু বেঁচেছিল, সম্ভবত উনি সঙ্গে নিলেন, আমরাও অপচয় করি না পারতপক্ষে। এখন স্টেশনে ফিরে ব্যাগ সুটকেস সংগ্রহ করে বাসস্থানে যেতে হবে। স্টেশন অবধি উনিও এলেন।
এবার একটা ঘটনা ঘটল, যেটা অদ্ভুত।
ভার্না থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে মাগুরাকা গুহার কাছাকাছি একটা জায়গায়। কদিন পরে সেইদিকের ট্রেনই ধরব। অর্থাৎ দক্ষিণ পূর্ব প্রান্ত থেকে সরাসরি উত্তরপশ্চিম প্রান্তে প্রায় সার্বিয়ার সীমান্তে। তা এই টিকিট যখন অনলাইনে কিনি, সে এক ভয়ানক বিপত্তি হয়েছিল, স্টেশনের নাম মানচিত্রে একরকম আর বুলগেরিয়ান রেলওয়ের লিস্টে অন্য রকম। মোটকথা টিকিট কিনবার পরেও মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ছিল। সেইটে ক্ল্যারিফাই করতে টিকিটের প্রিন্টাউট স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে দেখাতে, কাউন্টারের মহিলাটির তো চোখ কপালে, এরকম কোনও স্টেশনের নাম তিনি পুরো কর্মজীবনে কোনওদিন শোনেন নি। তারপরে অনেক বইটই ঘেঁটে, পাশের সহকর্মীকে ডেকে আনলেন। দুজনে মিলে আমাকে এমনভাবে দেখতে লাগলেন, যেন আমার মাথাতেও ছিট আছে এবং সেই সঙ্গে ছাপানো টিকিটটাকেও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। শেষমেশ ঐ স্টেশনের নাম খুঁজে পেয়েও ঐ দুজনের মনে খুঁতখুঁত। অবশেষে মাগুরাকা গুহার নিকটতম স্টেশন যেটা ওঁরা সঠিক মনে করলেন, সেটি আমার কেনা টিকিটের থেকে আর এক স্টপ দূরে। সেই অতিরিক্ত অংশটুকুর জন্য ছোট্ট দুটো টিকিট কেটে নেওয় হলো।
এবার ঐ মহিলাটি বিদায় নিলেন। অনেক মনোবল উনি জুগিয়েছেন আজ আমাদের, ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যায় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে অসংলগ্ন কথা, সে প্রসঙ্গে পরে বলব।
আমরা ট্যাক্সি নিয়ে হোমস্টে অভিমুখে রওনা দিলাম। বিছানায় একটু না গড়ালে আর চলছে না।
তবে সামনে একটা নাটক অপেক্ষা করছিল। বুলগারিয়ায় বাসস্থান খুঁজে পাওয়াটা যেন ক্রনিক সমস্যা হয়ে উঠেছে আমাদের।