এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের ছেলেটি : তৃতীয় পর্ব

    Rajkumar Mahato লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৯৫৬ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • খোলা আকাশের নিচে শুয়ে ছিল শিবরাম। কাগজ বেচার কমিশন দিয়ে জমিয়ে রাবড়ি খেয়েছে আজ। সিনেমা দেখা হয়নি। ভজা সাথে ছিল, সে একেবারেই এসব সিনেমা-টিনেমা দেখা পছন্দ করেনা। তার কাছে টাকা জমানোটা একটা সাধনা। শিবরামের পাশে বসে ছিল ছেলেটা। হালকা হাওয়ায় শহরের নিঃশ্বাস দুলছে খানিক। কিছুক্ষন পর ভজা শিবরামকে বলল " শিবুদা এক টাকা ইনকাম করে যদি এক সিকি জমা না করতে পারো। তাহলে আর তুমি কিসের বাঙালি? "

    যদিও এসব কথা শিবুর মাথার উপর দিয়ে যায়। তবুও কিছু একটা ভেবে ভজাকে সে বলল " আচ্ছা ভজা। ধর, তুই টাকা জমালি। পেট কেটে, সিনেমা না দেখে, রাবড়ি না খেয়ে। তুই বেশ ভালো মোটা টাকা জমিয়ে ফেলেছিস। এরপর যদি একদিন হঠাৎ করেই কোন অঘটন ঘটে আর তুই পটল তুলিস! তখন তোর টাকাগুলোর কি হবে?"

    ভজা কিছু না ভেবেই বলল " কি যে বলো। আমার মা রয়েছে। দু-দিন বাদে বউ হবে। খোকা-খুকি হবে। তারা ভোগ করবে।"

    শিবরাম ভজার দিকে তাকিয়ে বলল " যদি তোর জীবনে সেই দুই দিন না আসে? মানে এমনি বলছি!"

    ভজা ভ্রু দুটো কুঁচকে বলল " মা নেবে আমার টাকা।"

    শিবরাম হেসে বলল " তার মানে তুই নিজের জন্য টাকা রাখছিস না। তোর আপন জনের জন্য রাখছিস, তাই তো? "

    ভজা গর্বিত মুখের ভঙ্গিমায় বলল " হ্যাঁ, তা বলতে পার।"

    শিবরাম মুচকি হাসল। শান্ত দৃষ্টিতে ভজার দিকে তাকাল। মুচকি হাসল। তারপর বলল " তাহলে? আমার তো কেবল আমিই আছি ভাই। আপনজন আর পেলাম কই!"

    কথাটা বলেই জোড়ে জোড়ে হেসে উঠলো শিবরাম। তার সেই হাসি শহরের ফুটপাতের দিক-বিদিক ছড়িয়ে পরল। বুকের ভেতর তোলপাড় করতে থাকা একটা কষ্টের তুফান মুখ দিয়ে হাসির মাধ্যমে বেরিয়ে এল আজকে। কারণ, শিবরাম কাঁদতে শেখেনি।

    ভজা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে শিবরামের দিকে। তার হাসি দেখে ভজার দুচোখ জলে ভরে যায়। কত কষ্ট বুকে থাকলে মানুষ এইভাবে হাসতে পারে। ভজা কিছুটা জানে। আবার অনেকটা জানেনা।

    শিবরাম হাসি শেষ করে ভজার দিকে তাকায়। ভজার চোখে জল টলমল করছে। তার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে " পাগল। আমি হাসছি। আর তোর চোখে জল। সবসময় ফাস্টক্লাস থাক ভজা। কার কখন কি হয় কেউ জানেনা। ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা করে বর্তমানকে নষ্ট করে লাভ কি?"

    ভজা কোন কথা বলে না। কিন্তু তার চোখজোড়া অনেক না বলা কথা বলে যায়। সত্যিই তো মানুষটার আপন বলতে কি কেউ নেই? আপন কেউ থাকলে হয়ত এভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত না মানুষটা।

    আবার আকাশের দিকে আলতো চোখে তাকাল শিবরাম। আজ বড় মনে পরছে চাঁচলের কথা। পুরানো কোঠা বাড়িটা, উঠোনের সেই বড় জিওল গাছটা। মাঠের ওপারের সেই শিউলি গাছটা। মনে পড়ছে মায়ের কথা। মনে পড়ছে পাড়ার সেই দস্যি দিদার বলা একখান ইতিহাস। খুব মনে পড়ছে আজ, ফেলে আসা অতীত পিছু নিয়েছে ছেলেটার।

    দস্যি দিদার সাথে কাটানো সেই শৈশবের এক টুকরো বিকেল আজ শিবরামের মাথায় ভর করেছে। বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসাটা তার হয়ত উচিত হয়নি ঠিকই। কিন্তু ওই বাড়িতে থাকলে হয়ত সে বেঁচে থাকতে মারা যেত। আর কেই বা ছিল তার ও বাড়িতে। কেউ না।

    ছোটবেলা থেকে নিজের মনকে কোনদিন বুঝিয়ে কোন কাজ করেনি সে। মন যেটা যেই মূহুর্তে বলেছে সে সেই মূহুর্তে সেই কাজটা করে ফেলেছে। কত কথা আজ তার স্মৃতি পটে এসে ভিড় করেছে। কত কথা।

    শিবরামের বাড়িটা আগেকার রাজবাড়ি আদলের। আদলের কি, রাজবাড়িই ওটা। চাঁচলের রাজা ঈশ্বরচন্দ্র তার দাদু। তার ঠাকুমা সিদ্ধেশ্বরী ও আর-এক ঠাকুমা ভূতেশ্বরী ছিলেন এই রাজার দুই রানী।

    সেইদিন ভোরে একটা জোড়ালো হাঁক ডাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন দস্যি ঠাকুমা। দেখেন উঠোনে শুয়ে পরে কাঁদছেন সিদ্ধেশ্বরী। একটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভূতেশ্বরী। হন্তদন্ত হয়ে ভূতেশ্বরীর কাছে গেল দস্যি দিদা। চোখদুটো বড় বড় করে বলল " কি হয়েছে বউ?"

    ভূতেশ্বরীর মুখে কোন কথা নেই। চোখদুটো অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে অনবরত। আঙুল তুলে ঈশ্বরচন্দ্রের শোওয়ার ঘরের দিকে দেখাল ভূতেশ্বরী।
    দস্যি দিদা লাঠিতে ভর দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের ঘরে গিয়ে মৃত ঈশ্বরচন্দ্রকে দেখল। চৌকাঠে বসে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল বুড়ি " আহা বাছা আমার। আমি এখনও রয়েচি। আমার বাছাটা চলে গেল। ও মা গো। হে ভগবান এ তোমার কি বিচার!"

    ততক্ষনে বাড়ির ঊঠোনে জড়ো হয়েছে গ্রামের লোক। বুড়ি আরও চেঁচিয়ে বলতে থাকল " দু দুটো ব‌উ থাকতে বাছাটা আমার সন্তানের মুখও দেখতে পারল না। এ রকম দূর্ভাগ্য যেন কারোর না হয়। ভগবান, মহাদেব ওঁকে নিজের চরণে ঠাঁই দিও বাবা।"

    আসলে সত্যিই দুটি পত্নীকেই নিঃসন্তান রেখে মারা
    যান ঈশ্বরচন্দ্র। তাই সিদ্ধেশ্বরী তার বোনের পুত্র শিবপ্রসাদ’কে দত্তক নিয়ে মানুষ করেন। শিবপ্রসাদ এই বাড়ির দুই মায়ের চোখের তারা হয়ে ওঠেন। তার সমস্ত অন্তরআত্মায় প্রবেশ করতে শুরু করে রাজবাড়ীর বংশপরিচয়।

    ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে শিবপ্রসাদ। রাজপরিবারের ছেলে হিসেবে মানুষ হলেও রাজকীয় ভাবটা পায়না সে। বিষয় সম্পত্তি অথবা সংসার জীবনের কোন মায়াই তার মধ্যে বর্তমান নেই। সারাদিন ভবঘুরের মত আগানে-বাগানে ঘুরে বেড়ায় কৈশোর বয়সের শিবপ্রসাদ।

    তবে তার এই এদিক ওদিক ঘুরে বেরানোর মধ্যেও একটা সুপ্ত উদ্দেশ্য ছিল। চরিত্র তার একেবারেই ভালো না। পদ্মপুকুরের থেকে কিছু দূরে একটি বট গাছ ছিল। ঝাঁকড়া ডালপালা নিয়ে নিজের একটা বেশ বড় ধরনের ঝোপ তৈরি করেছিল গাছটি। তার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত শিবপ্রসাদ এবং গ্রামের মেয়ে বউদের স্নান করা দেখত।

    কলসী কাঁকে মেয়েরা জল আনতে যেত নদীতে। তাদের দোলানো কোমর দেখতে তার খুব ভালো লাগত। লোকের বাড়ির আনাচে কানাচে তাকে অনেকবার আবিষ্কার করেছিল গ্রামবাসীরা। কেবল রাজবাড়ির সন্তান বলে তারা কিছু বলত না।

    কিন্তু একদিন দস্যি ঠাকুমার কানে গেল কথাটা। সে সিদ্ধেশ্বরীর কাছে এসে বলল পুরো ব্যাপারটা। সব শুনে সিদ্ধেশ্বরী মুচকি হেসে বলল " তোমরা বলো রাজবাড়ির কোন গুণ নেই ওর মধ্যে। তা এই গুনটা তো ঠিক পেয়েছে খুড়িমা।"

    দস্যি দিদা আর কোন কথা বলেনা। শিবপ্রসাদের বিয়ে ঠিক হয় হেমাংগিনীর সাথে। সবাই ভাবে বিয়ে দিলে ছেলের চরিত্র বোধহয় বদলে যাবে।

    (চলবে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৯৫৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন