এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ওলো সই_১  #শ্লীলতাহানি—শব্দটা এত ভদ্র কেন? 

    CHAKRABORTY MOU.Religance Rangamati লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • ১ | ২
    শ্লীলতাহানি—শব্দটা এত ভদ্র কেন?
    রাত সাড়ে দশটা। বাসস্ট্যান্ডের হলুদ আলোটা মিটমিট করে জ্বলছে আর নিভছে। শেষ বাসটা সবে একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল। রাস্তাটা হঠাৎ ফাঁকা আর নিস্তব্ধ। সেই নিঝুম রাস্তায় দুজন মানুষ। একজন সে, আর অন্যজন একটা ছায়া। মেয়েটা হাঁটার গতি বাড়াল। খট-খট-খট। হিলের শব্দটা নির্জন রাতে বড্ড বেশি স্পষ্ট। পিছনের ছায়াটাও নিজের গতি বাড়াল। মেয়েটা কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে আঙুল কাঁপছে। কাকে ফোন করবে? বন্ধুকে? বাড়িতে? নাকি পুলিশকে? হঠাৎ পেছন থেকে একটা শিস ভেসে এল। খুব হালকা, কিন্তু চেনা আর তীক্ষ্ণ। মেয়েটা পিছন ফিরে তাকাল না, কিন্তু তার ঘাড়ের কাছে যেন একটা বরফ-ঠান্ডা নিঃশ্বাস টের পেল।

    তারপর কী হলো, সই? সিনেমা হলে দর্শক আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন চড়া সুরে বেহালা বাজছে! পর্দায় নায়ক মুচকি হেসে মেয়েটার হাতটা টেনে ধরেছে, আর বড় বড় অক্ষরে ভেসে উঠছে ‘প্রেমের প্রথম অধ্যায়’! আহা, কী রোম্যান্টিক! কী কাব্যিক দৃশ্য! এবার পর্দাটা ছিঁড়ে ফেল সই, আয় বাস্তবের রাস্তায় দাঁড়া। বাস্তবে ওই মেয়েটার বুকের ভেতরে রক্ত লাফাচ্ছে, গা গুলিয়ে বমি আসছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে হিম হয়ে আসছে। সে প্রতি পদক্ষেপে ভাবছে, আজ রাতে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরতে পারবে তো? আর আমরা? সভ্য সমাজের ড্রাইংরুমে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কী বলছি? ও তো সামান্য একটা শ্লীলতাহানি!

    কী মিষ্টি আর ভদ্র শব্দ, তাই না? ‘শ্লীলতাহানি’! শুনলেই মনে হয়, কোথাও বড় কোনও অপরাধই হয়নি। যেন আলমারি থেকে শাড়ি বের করতে গিয়ে আঁচলটা দরজার হাতলে আটকে একটু ছিঁড়ে গেছে! যেন ভিড়ের বাসে অসাবধানতায় ভুল করে কারও গায়ে হাত লেগে গেছে! ধর্ষণ বললে নাকি সভ্য সমাজের কানে লাগে, অস্বস্তি হয়, তাই আমরা তার নাম রেখেছি ‘নির্যাতন’। যৌন হয়রানি বললে বড্ড ভারী শোনায়, তাই নাম দিয়েছি ‘অশালীন আচরণ’। পিছু নেওয়া বললে ভয় লাগে, তাই ভালোবেসে নাম দিয়েছি ‘ইভটিজিং’! ইভটিজিং! যেন ছেলেটা কোনও অপরাধ করেনি, মেয়েটাই একটা পরীক্ষা দিতে বেরিয়েছিল আর ছেলেটা তার খাতাটা টেনে নিয়ে একটু দুষ্টুমি করেছে! আমাদের ভাষারও কত লজ্জা, সই! অপরাধীর অপরাধ ঢাকতে কত নরম কাপড়ের মোড়ক বেছে নেয় আমাদের অভিধান!

    আর সমাজ? সমাজ তখন আতশকাচ নিয়ে বসে পড়েছে। কিন্তু অপরাধীর দিকে নয়, সরাসরি মেয়েটার দিকে! মেয়েটা অত রাতে বাইরে কী করছিল? পোশাকটা দেখেছ? জামাটা কতটা ছোট ছিল? মেকআপটা একটু বেশিই ছিল না? ছেলেটার সঙ্গে আগে থেকে আলাপ ছিল না তো? সোশ্যাল মিডিয়ায় কী কী ছবি পোস্ট করে? ব্যস, গল্প জমে ক্ষীর!
    ড্রয়িংরুম থেকে সোজা ফেসবুকে আদালত বসে গেছে। মোমবাতি তৈরি, হ্যাশট্যাগ রেডি, টিভিতে প্রাইম টাইমের খবর তৈরি! চাঞ্চল্যকর ঘটনা, চাঞ্চল্যকর দাবি, নির্যাতিতা তরুণী, অভিযুক্ত যুবক! ক্যামেরা ঘুরছে, কিন্তু ক্যামেরা কার দিকে? মেয়েটির ভয় পাওয়া চোখ দুটোয়?
    না! ক্যামেরা নেমে গেছে তার জামার দিকে, তার উন্মুক্ত কাঁধের দিকে, তার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শরীরের দিকে! কারণ মেয়েটা তো আমাদের কাছে মানুষ নয়, সে একটা দৃশ্য! তার আতঙ্কটাও বিনোদন, তার অপমানটাও খবরের টিআরপি!

    এদিকে অপরাধী নিশ্চিন্তে মোড়ের মাথায় চা খাচ্ছে। কারণ সে জেনে গেছে, এই সমাজে পুরুষ যদি অন্যায় করে, তবে সেটা ‘ভুল’ বা ‘বয়সের দোষ’। আর মেয়েটি যদি প্রতিবাদ করে, তবে সেটা ‘বাড়াবাড়ি’! পুরুষ যদি জোর করে হাত টানে, তবে সেটা ‘ভালোবাসার টান’। আর মেয়েটা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সেটা ‘অহংকার’! ছেলেদের জন্য আমাদের কোনও পাঠশালা নেই, কোনও সিলেবাস নেই। অন্যের অনুমতি কাকে বলে, ‘না’ কথাটার আসল অর্থ কী—এসব নাকি কোনও পাঠ্যক্রমে লেখা নেই!
    আমরা শুধু মেয়েটাকেই সারাজীবন তালিম দিয়ে যাই—ছাতা রাখিস, মরিচের গুঁড়ো রাখিস, মোবাইলে লোকেশন শেয়ার রাখিস, রাতে একা বেরোবি না, বেশি হাসবি না, ভালো মেয়ে হবি! জানিস সই, এই ‘ভালো মেয়ে’ শব্দটার ভেতরে শত শত বছরের প্রাচীন একটা সামাজিক তালা ঝুলছে! ভালো মেয়ে চিৎকার করে না, ভালো মেয়ে থানায় যায় না, ভালো মেয়ে নিজের শরীরটাকে নিজের বলে সোচ্চার দাবি করে না! আর খারাপ ছেলে? তাকে আমরা কোনওদিন বলি না—‘মানুষ হ’!

    সই, এবার একটু থাম। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নে। ভাব তো, একদিন যদি এই মিথ্যাচারের অভিধানটা সত্যি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়? যদি এই সবকটা সমাজ-বানানো ভদ্র শব্দ—‘শ্লীলতাহানি’, ‘ইভটিজিং’, ‘অশালীন আচরণ’, ‘বাড়াবাড়ি’, ‘ছেলেমানুষি’—একসঙ্গে সেই আগুনে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়? যদি স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, অনুমতি ছাড়া কোনও মেয়ের শরীরে হাত দেওয়া কোনও সামান্য ‘হানি’ নয়, ওটা সোজা শারীরিক আক্রমণ! অনুমতি ছাড়া পিছু নেওয়া কোনও ‘প্রেম’ নয়, ওটা মানসিক সন্ত্রাসী আক্রমণ! যে ছেলে পিছু নেয়, সে নায়ক নয়—সে অপরাধী! যে ‘না’ শুনেও থামে না, সে রোম্যান্টিক নয়—সে অভদ্র! আর যে মেয়েটা চিৎকার করে হাত ছাড়িয়ে নেয়, সে বেয়াদব নয়—সে নিজের শরীরের একমাত্র স্বাধীন মালিক!
    মেয়েটা এখনও সেই নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। জামা বদলানো যায়, রাস্তা বদলানো যায়, বাড়ি ফেরার সময় বদলানো যায়—কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে যে সমাজ বদলায় না, সে কথা আজ বড় স্পষ্ট। প্রশ্নটা তাই আর জামার দৈর্ঘ্য বা রঙের নয়, সই। প্রশ্নটা হলো—সেই অসভ্য দেখার চোখটা আসলে কার?

    রাত এখন পৌনে এগারোটা। ফাঁকা রাস্তায় মেয়েটা এখনও হেঁটে চলেছে। পিছনের ছায়াটাও তার পিছু পিছু হেঁটে আসছে। হঠাৎ মেয়েটা থামল। পকেট থেকে বের করা ফোনটা আবার ভেতরে ঢোকাল। দু-হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল। তারপর ধীরপায়ে সোজা ঘুরে দাঁড়াল। কোনওরকম ভয় ছাড়া সোজা ছায়াটার চোখের দিকে চোখ রেখে তাকাল। এবার বল সই, ছায়াটা কি ভয় পাবে? নাকি আমাদের সমাজ আবার পেছন থেকে সুর তুলে ডেকে উঠবে—আহা, মেয়েটার আরেকটু ‘শ্লীল’ হওয়া উচিত ছিল!

    _@শ্রীমতী

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ১ | ২
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন।