ক্লাস এইট-নাইন। বয়ঃসন্ধির এথনিক ষ্টেজ, মাথাগরমের কাল। রূপকথার রাজকুমারী, সুনীলের সোনালী-দুঃখ, হুমায়ুন আহমেদের 'মায়াবতী' ছাড়িয়ে স্বপ্নে,হোমওয়ার্কে, লুকিয়ে বইপড়ায় ঢুকে পড়েছেন ইলা মিত্র, লতিকা সেন থেকে সিলিয়া সানচেজ বা বলিভিয়ার তানিয়া। ছোটোবেলার ঘুম-ঘুম মুগ্ধতায় লেগেছে জৈষ্ঠ্যের জ্বালাপোড়া রোদ। এরমধ্যেই এক শীতের বিকেলে চোখ রাখা ষোড়শী আর জীবানন্দের উপাখ্যানে। বেশ কিছুটা পড়ার পরেই যেখানে ষোড়শীকে পাইক-লাঠিয়ালরা টেনে নিয়ে গিয়ে জমিদার জীবানন্দের সামনে হাজির করলো, সেই অংশটায় পৌঁছানো। জীবানন্দের মাতলামো আর লাম্পট্যের চিহ্নে ঘরটির বর্ণনা 'নরকের খন্ডচিত্র'। দেয়ালে ঝুলছে ভোজালি, বুকের কাছে দো-নলা বন্দুক আর দুটি নতুন চকচকে পিস্তল। সাদা-কালো-বেঁটে-লম্বা-দিশি -বিলিতী নানারকম মদের বোতলে ঘর পরিপূর্ণ। সেখানে ষোড়শীকে কদর্য অপমান ও বাক্যধর্ষণের পর যখন সে 'মরফিয়া' ওষুধ দিয়ে যেতে বলে, আর কম্পিত হস্তে বিনাবাক্যব্যয়ে ষোড়শী তাই করে, মাথায় আগুন জ্বলে গিয়েছিলো তখনই। নাহয় পূজারী গৃহস্থের মেয়ে একটা কাঁচের বোতল তুলে এক ঘা দিতে পারবেই না, নাহয় পাইকের দল বাবুর ঘরের বাইরেই বসে আছে, কিন্তু বাবা, তাদের তো অক্ষর পরিচয় নেই ! মরফিয়া কাঁচের ঝিনুকে আধ-ঝিনুকের বেশী হলেই ও ব্যাটার নিদ্রা আর ভাঙবে না, তা সেটা মুখে ঠুসে দিতে কী হয়েছিলো? ষোড়শী কেঁদেছে আজন্মপূজিতা মা চন্ডীর কাছে এই মহাপাপিষ্ঠের মুক্তির বার্তা জানিয়ে। যার কাছে ধর্ম-অধর্ম জ্ঞান নেই, শ্মশান ও গৃহের ফারাক নেই, প্রাণ নেওয়া, নারীর সম্মান নেওয়া তুচ্ছ কাজ -- নিজের প্রাণ সুরার স্রোতে বিলীন করে দেওয়াটাও তেমনি, তার উদ্ধার কি মা চন্ডীর পক্ষেও সম্ভব? হয়তো সেই পাপিষ্ঠের মুক্তি কোনো অর্থেই নেই। তবু প্রশ্ন জাগে মনে, জীবানন্দদের সংশোধন কি সত্যি সম্ভব? নাকি আরো অনেক অনেক তারাদাস চক্রবর্তীরাই বাস্তব? আজকে নাম ও রূপ বদলে জীবানন্দরাই পরমানন্দে 'সভ্য সমাজে' চড়ে বেড়ান। তো কথা হলো, ভীষণ রেগে বিষম খেয়ে ওই উপন্যাসটা সেখানেই পড়া বন্ধ করেছিলাম, খুলেছি আবার বহু পরে। অমর কথাশিল্পীর বহু সৃষ্টির মধ্যেই জীবানন্দ আর ষোড়শী আমাকে সবথেকে বেশী ভাবিয়েছে। এখানে মনে পড়ে বিদেশী কবির বিখ্যাত উক্তি, "Love is cannibal." জীবানন্দের উক্তি ছিলো গোমস্তা এককড়ির প্রতি -- "আর বুঝলে বাপু....আমি বিবাহ করিনি, কোনোদিন করবোও না। তা বলে তো ভীষ্ম বা শুকদেব হইনি। সুতরাং বুঝলে,....ওটা চাই।"
এককড়ি লজ্জায় মুখ নামায়। জমিদারে গোমস্তা পর্যন্ত যে প্রসঙ্গের উল্লেখে লজ্জা পায়, তা যে মানুষ অবলীলায় বলে যেতে পারে, সেও আসতে পারে সৃষ্টির সীমানায়। শরৎচন্দ্রের বিশেষত্ব তাই বাস্তব নিরূপণ করা নয়, চরিত্র সৃজন করার থেকে অনেক অনেক বেশী বাস্তব চরিত্র তুলে ধরা। জীবানন্দ তার শারীরিক বা যৌন তৃপ্তির যে আঙ্গিক খুঁজে পেয়ে নিজেকে বিজয়ী ভাবে, তাকে পরাজিত করার প্রচেষ্টায় নয় বরং আত্মসমীক্ষার দ্বারা নিজের অবস্থান খুঁজে নেয় ষোড়শী। এইপ্রসঙ্গেই মনে পড়লো, সম্প্রতি প্রকাশিত অ্যাঞ্জেলা কার্টারের সম্পাদিত বই ' দ্যা ব্লাডি চেম্বার' -এর কথা। চিরন্তন ইউরোপীয় রূপকথার গল্পগুলিকে নব আঙ্গিকে, নতুন মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন লেখিকা। আমাদের অতিপরিচিত ছোটগল্প 'লিটিল রেড রাইডিং হুড' সেখানে বনপথে নিজের পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে গিয়ে যে সুদর্শন পুরুষের দেখা পায়, আসলে সে ওয়্যার-উল্ফ। তার পরিতৃপ্তি যেমন নিগ্রহে, তেমনি তার অস্থির লালসার নিয়ন্ত্রক হয়ে রেড রাইডিং হুড খুঁজে নেয় নিজস্ব যৌন পরিচয়। নারীমাংসের উল্লেখ হয়তো তাই এতো ঘুরেফিরে সাহিত্যে আসে। আধুনিক সাহিত্যিক হিমাদ্রীকিশোর দাশগুপ্তের 'বন্দরসুন্দরী' তে ভর্তৃকা তার প্রভুকে প্রশ্ন করে, "মৎস্য রন্ধনে খাদ্য গ্রহণ করে মানুষের তৃপ্তি হয়। তবে মৎস্য একটি খাদ্যদ্রব্য। কেবল নারীর নামই মৎস্যগন্ধা কেন হয়?" আর নিজেকে এই তথাকথিত ' piece of meat' হিসাবে দেখতে দেখতেই কি আসে নারীর যৌনতার প্রতি বিতৃষ্ণা? নাকি নিছক সামাজিক ট্যাবুই তাকে প্রতিহত করে জার্মেইন গ্রিয়ার কথিত 'engage with libido' চিন্তন থেকে? নোবেলজয়ী সাহিত্যকীর্তি 'ভেজেটেরিয়ান' এর মূল নায়িকার মধ্যে আমরা যেভাবে দেখতে পাই আমিষ খাবারের প্রতি অনাসক্তি। কারণ প্রত্যহ যৌনমিলনের সময়ে যে নিজে ব্যবহৃত হচ্ছে একখন্ড মাংস হিসাবে। তাই ধীরে ধীরে খাদ্যে অনীহা ও মনুষ্যসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে নিজেকে দেখে একটি উদ্ভিদে রূপান্তরিত হতে। যেখানে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক নেই, আছে কেবল নীরব শান্তি (বিধিসম্মত সতর্কীকরণ : এটা পড়ে কেউ আবার পবর আমিষ-নিরামিষ বিতর্কে ঝাঁ করে ঢুকে পড়বেননি, তেমন হলে যৌনতা ও ক্যানিবালিজম এবং আমিষ বিতর্কের ডিসকোর্স নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছে রইলো।)
শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি করা নারীচরিত্র বললেই, ঘুরেফিরে মনে আসে সেই পাত পেড়ে পাখা নেড়ে খাওয়ানোর উপাখ্যান। যাকে মেয়েরা যে সুখ চোখের সামনে যত্ন করে পুরুষকে খাইয়ে পায়, তেমনটা আর কোথাও নয় বলে, কালবেলার অনিমেষ উল্লেখ করো, "শরৎচন্দ্রীয় সুখ।" অবশ্য আমার পরবর্তী উপলব্ধির কথা এই যে, তথাকথিত নারী-পুরুষ দৃষ্টিতে না দেখে সমকালীন সমাজের একটি চলমান চিত্র এঁকে তিনি পথের দিশাও কোথাও কোথাও দিয়ে গেছেন। কেবল 'রানিং কমেন্ট্রি' অনুসরণ করা ইউরিপিডিস নন, সত্য-শিব-সুন্দরের অলৌকিক আরাধনায় থাকা সফোক্লিস নন, তিনি বাংলার সমাজরূপের পরিপূর্ণ চিত্রকর। ঘোর অমানিশায় পথ হারাতে হারাতে তাই সব্যসাচীর খোঁজে আজও দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বেলে রাখা যায়। আর আলোর এক ঝলক দেখতে পাই, যখন বেণী জমিদারের সহস্র শাসন সত্ত্বেও রমার মহামায়া পুজোয় গোটাকয়েক ব্রাহ্মণ ছাড়া সমস্ত হিন্দু-মুসলমান সুবিশাল সংখ্যক প্রজা থাকে অনুপস্থিত। পাহাড় প্রমাণ অন্নব্যঞ্জন পড়ে থাকে, তবু নিত্য অনাহারে মরা কৃষকরা তাদের ছোটবাবুর জেলযাত্রায় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে থাকে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া থেকে। পল্লীসমাজের রমার চরিত্রটি দেবদাসের থেকেও ট্র্যাজিক। দেবদাস সংসারের পদপ্রান্তে এসে ফেলে যন্ত্রণাদগ্ধ শেষ নিঃশ্বাস আর রমা সংসার ত্যাগ করে খুঁজে চলে শেষ শান্তির মুহূর্তটি। তবুও সব জটিলতাকে ছাপিয়ে পল্লীসমাজের চিরকালীন আলোর নিশান এই, কেবল জমিদার আর ব্রাহ্মণ পারে না ছোটোলোকদের সমাজচ্যুত করতে, ছোটোলোকরাও পারে উচ্চ সমাজ ত্যাগ করতে। হিন্দু-মুসলমান এক হতে পারে শুধু দুর্ভাগ্য ও দারিদ্র্যের আত্মীয়তার বন্ধনে। সনাতনের মতো হাড় জিরজিরে, নিঃস্ব লোকের কন্ঠেও উচ্চারিত হতে পারে, "আমার নয় জমি, হালবলদ আপনার কাছে বাঁধা আছে বড়বাবু। কিন্তু ছেলেছোকরাদের তো রক্ত গরম, তারা সব জাফর আলির বাড়ি ষাট করছে। হিন্দু-মোসলমান সব ভাই পাতিয়েছে। একটু সাবধানে, বাবু।"
সনাতনের চাপা বিদ্রূপে বা জ্বলে ওঠা কৃষকের লাঠির ঘায়ে বেণীর শিক্ষা নয়, বেণীর প্রকৃত শিক্ষা মাতৃবক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। রমার শয্যাপ্রান্তে তাই বেণীর আঘাত প্রসঙ্গে বিশ্বেশ্বরী বলেন, "এ যদি ক্ষমা করতে না পারবো তবে আর সংসারে শিখলুম কী মা? জানবে, কয়লাকে শতবার ধুলেও পরিচ্ছন্ন হয়না, তাকে আগুনে পোড়াতে হয়।"
বাঙালির চিরকেলে বাণী, "মায়ের বাড়া অসহায় জীব নেই" যেন কোথাও গিয়ে বিশ্বেশ্বরীর সাদা থানের আঁচলে ঘেরা সোনার বরণ পা-দুটিতে কঠিন আঘাত খেয়ে পড়ে। তিনি রমাকে বুকে করে সংসার ত্যাগ করতে পারেন, কৃষককে সাহস দিতে পারেন আবার সন্তানের নির্মম কাজের চরম শাস্তিকে সমর্থন করার স্পর্ধা রাখেন। শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্রদের কোনো নির্দিষ্ট বন্ধনীতে বাঁধা সহজ কাজ নয়। ভারতীর তো স্বাধীনতায় নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক থেকে সুমিত্রার মতো আশ্চর্য নারী যেমন সেখানে উপস্থিত, তেমন ললনা বা শুভদার মতো সর্বহারা স্বরও অশ্রুত নয়। বাংলার প্রতিদিনের যাপনের সুর তাঁর কলমে গ্রন্থিত। আজকে হিন্দু-মুসলমান-বাঙালি-বিহারীকে একবার স্পন্দিত করার জন্য রামদাস তলওয়ারকরের উচ্চকন্ঠের ঘোষণা যেমন জরুরি মনে হয়, তেমনই একজন বিজয়া, একজন ভারতী বা একজন নবতারাও বঙ্গভূমে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েনি। শুধু সময়ের দাবী মেনে পটপরিবর্তন চলে তার চালচিত্রে, চিত্রণের ধারায়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।