এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ব্যস্ত শহর, মৃত হয়

    Abhijit Halder লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ মার্চ ২০২৬ | ২৪ বার পঠিত
  • ব্যস্ত শহর, মৃত হয়
    অভিজিৎ হালদার

    শহরের নামটা জরুরি নয়। কারণ সব ব্যস্ত শহরের গল্পই এক—কংক্রিটের হাড়গোড়, ধোঁয়ার দীর্ঘশ্বাস আর যান্ত্রিক কোলাহল। কিন্তু এই শহরের একটা বিশেষত্ব ছিল; ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে এখানে মানুষের রক্ত চলাচল করত।

    অর্ক ছিল এই শহরের এক প্রান্তিক পর্যবেক্ষক। প্রতিদিন বিকেলে সে একটি পরিত্যক্ত ফ্লাইওভারের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের পিঁপড়ের মতো সারি সারি গাড়ি আর মানুষের স্রোত দেখত। তার মনে হতো, এই শহরটা একটা বিশাল দানব, যার পেটে কয়েক কোটি ছোট ছোট স্বপ্ন প্রতিদিন হজম হয়ে যায়।

    সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। অফিস ফেরত মানুষের ভিড়, বাসের কন্ডাক্টরের চিৎকার আর সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতির লুকোচুরি—সবই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু রাত আটটা বাজতেই শহরটা অদ্ভুত আচরণ শুরু করল।

    প্রথমে নিভে গেল রাস্তার সব বাতি। কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নয়, যেন শহরটা নিজেই চোখ বুজে ফেলল। এরপর থামতে শুরু করল শব্দেরা। চলমান গাড়ির ইঞ্জিনগুলো হঠাৎই নিস্তেজ হয়ে পড়ল, যেন কেউ তাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, মোবাইলের রিংটোন, এমনকি বাতাসের শব্দটাও হঠাৎ উধাও।

    অর্ক দেখল, তার চোখের সামনে এই বিশাল মহানগরীটা ধীরে ধীরে একটা মস্ত বড় লাশে পরিণত হচ্ছে।

    মানুষগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাউকে ধাক্কা দিচ্ছে না, কেউ ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে গালি দিচ্ছে না। সবাই যে যার জায়গায় পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ। বহুতল ভবনগুলোর কাঁচের গায়ে চাঁদের আলো পড়ে এক ভুতুড়ে আভা তৈরি করছে। অর্ক যখন ফ্লাইওভার থেকে নিচে নামল, সে নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠল। এত নিঃশব্দ এই শহর আগে কখনো ছিল না।

    অর্ক ফুটপাতে বসা এক বৃদ্ধ ভিখারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বৃদ্ধের চোখে কোনো জ্যোতি নেই, কিন্তু তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি। অর্ক তাকে জিজ্ঞেস করল, "সবাই এমন স্থির কেন? শহরটা কি থেমে গেল?"

    বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "না রে পাগল, শহরটা থামেনি। শহরটা আসলে আজ মৃত। এতদিন যা দেখেছিস তা ছিল লাশের ওপর মেকআপ। এই শহরটা অনেক আগেই মারা গিয়েছিল যখন মানুষ পাশের মানুষের কান্না শোনা বন্ধ করেছিল। আজ শুধু তার আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্য চলছে।"

    অর্ক খেয়াল করল, রাস্তার পিচের বুক ফেটে ছোট ছোট ঘাস আর বুনো ফুল ফুটে উঠছে। কংক্রিটের শরীর চিরে প্রকৃতি তার অধিকার ফিরে নিতে শুরু করেছে। লোহার রডগুলোতে মরচে ধরছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। শহরটা যত বেশি 'মৃত' হচ্ছে, ততই যেন সে আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে অন্য এক রূপে।

    গভীর রাতে অর্ক শহরের মাঝখানে শুয়ে পড়ল। কোনো হর্ন নেই, কোনো তাড়া নেই। সে অনুভব করল, ব্যস্ত শহর যখন মৃত হয়, তখনই কেবল মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায়। নীল গ্রহের ধমনীতে তখন অন্য এক বিপ্লব শুরু হয়—এক আদিম শান্তির বিপ্লব।

    ভোরবেলা যখন সূর্য উঠল, শহরটা আর আগের মতো ছিল না। পিচঢালা রাস্তাগুলো ধুলোয় মিশে গেছে, আকাশছোঁয়া ভবনগুলো ঢেকে গেছে সবুজ লতায়। ব্যস্ততা যেখানে শেষ হয়, জীবনের আসল গল্প বোধহয় সেখান থেকেই শুরু হয়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন