পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজের টাকায় নিজের বিরুদ্ধে একটি অকাট্য প্রমাণপত্র তৈরি করেছে। এমন সততা আজকাল দুর্লভ। "লক্ষ্মী এলো ঘরে" দেখে মনে হলো সরকার হয়তো ভুল করে ডকুমেন্টারি বানিয়েছিল, পরে আইডিয়া এলো - এটাকে ফিচার ফিল্ম বলে চালিয়ে দিই। কাহিনী এমন - গোপাল বাড়ুই মরে গেল (সারদায় টাকা রেখেছিল কিনা জানা যায়নি), বিধবা স্ত্রী লক্ষ্মী এখন শাশুড়ির অত্যাচার আর গ্রাম্য মাতব্বরের হেনস্থায় অবরুদ্ধ। পাশে আছে চিরকালের বন্ধু সুজন, যে হোয়াটসঅ্যাপের চেয়ে দ্রুত হাজির হয়। প্রেম না সেবা, তা নিয়ে দর্শকের মনে হালকা সন্দেহ থাকলেও ছবি সেদিকে যায়নি।
ছবিতে দেখানো হলো মাটির ঘর। সেই ঘর ভেঙে পড়লে "বাংলার বাড়ি" প্রকল্পের টাকা মিললো। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা নিশ্চয়ই চালচোর পার্টি হজম করেছিল। ঘরের সামনে কাঁচা রাস্তা, অথচ "পথশ্রী" প্রকল্পের বিজ্ঞাপন চলছে পুরোদমে। স্কুলে একটিমাত্র ক্লাসরুম, ৩২টি মেয়ে, একজন শিক্ষক। স্কুল সার্ভিস বন্ধ থাকায় এই দুরবস্থা - এতো পরিষ্কার করে আর কে দেখাবে? শুভশ্রী অপুষ্টির শিকার, কিন্তু তার মুখের জেল্লা অটুট। কোন সানস্ক্রিন? নাকি সরকার এটাও বিনামূল্যে দেয়? শাশুড়ির হাঁটুর সার্জারির জন্য সরকারি হাসপাতালে কোনো ব্যবস্থা নেই, চলো বেসরকারি নার্সিং হোমে। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর এমন সত্য উন্মোচন করায় মুখ্যমন্ত্রীর সাহসকে প্রণাম।
সবচেয়ে বড় কথা - লক্ষ্মী কখনো থানায় যায় না। মাতব্বর তাকে হেনস্থা করে, প্রাপ্য টাকা মেরে দেয়, শাশুড়ি মানসিক অত্যাচার করে - তবু সে পুলিশের কাছে যায় না। একবার যখন গেল, পুলিশ বললো "ঘরের ঝগড়া ঘরেই মেটাও।" NCRB-র কাছে যে ডেটা যায়, আসল অপরাধের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি - এই নির্মম সত্য পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে। এমন আত্মসমালোচনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সরকার যদি বিরোধী দলের ভূমিকায় নামে, বিরোধীদের আর কী করার থাকে?
আরও কিছু প্রত্যক্ষণ। অঙ্কুশের মাথায় টাক স্পষ্ট, পরচুলার ব্যবস্থা নেই - এটা কি নতুন কোনো প্রকল্পের ইঙ্গিত? ডাক্তারের ভূমিকায় অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন মুনমুন সেনের পুনর্জন্ম। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ অথচ উচ্চারণ খাঁটি কলকাতার - এই ভৌগোলিক বিস্ময় আমাদের নতুন কিছু শেখায়। শুভশ্রীর ঘর ভেঙে পড়ার পর শাশুড়ি নার্সিংহোমে, কিন্তু শুভশ্রী আর অঙ্কুশ কোথায় ছিল? দাল মে কুছ তো কালা হ্যায়। তবে ছবির শেষে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সাথে অরুপ বিশ্বাস আর সুজিত বসু - যুবভারতী মেসি কাণ্ডের পর ঝুঁকি এড়ানোর পদক্ষেপ বোধহয়।
সুতরাং সবাই মিলে এই ছবি দেখুন। পশ্চিমবঙ্গের দুর্দশার এমন প্রামাণিক দলিল আর কোথায় পাবেন? সরকার নিজেই নিজের ব্যর্থতার ক্যাটালগ বানিয়ে দিয়েছে। লক্ষ্মী ঘরে এসেছে কিনা জানি না, কিন্তু সত্য নিশ্চয়ই এসেছে - অনিচ্ছাকৃত হলেও। আর সেই সত্যের নাম - আমাদের অবস্থা আসলে কেমন। শুভস্য শীঘ্রম। মিস করবেন না কিন্তু।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।