এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • সন্তুদের বাড়ি 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২ বার পঠিত
  • বজবজে বোনের শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল বিভাস ঘোষদস্তিদার। সে নিজে অবিবাহিত। বাড়ি শ্যামবাজারে রামকান্ত বোস স্ট্রীটে। বর্ষাকাল। আজ সারাদিন মেঘলা। বিভাস যখন নামল শিয়ালদা সাউথের প্ল্যাটফর্মে বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে। গাদা গাদা লোক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গেছে।ব্যস্তবাগীশ লোকেরা ছাতা খুলে বা ছাতা ছাড়াই ঝটপট বেরিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি ভেজা রাস্তায়।বিভাসের কাছে ছাতা ছিল। সে ছাতা খুলে লোকজন ঠেলেঠুলে স্টেশনের বাইরে এল, শিয়ালদা ফ্লাইওভারের দিকে।সারাদিন ধরেই থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিকে জলকাদায় লেবড়ি চেবড়ি অবস্থা। সন্ধে নেমে গেছে। বাতি জ্বলে উঠেছে দোকানবাজারে। 
       মেন গেটের দিক দিয়ে বেরিয়ে উড়ালপুলের তলায় দোকানপাটের মধ্যে দিয়ে ওদিকে যাচ্ছিল চায়ের দোকানে চা খাওয়ার জন্য। এদিকে এলেই প্রকাশ ঝা-এর দোকানে চা খায় বিভাস। দারুন লাগে। এই বর্ষায় আরো জমবে।
     ছাতাটা গোটাতে গোটাতে দু সারি দোকানের গলতা দিয়ে ওদিকে যাচ্ছিল সে।উল্টোদিক থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা খেল বিভাস।মনে হল লোকটা যেন ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিল। তা নাও হতে পারে। কিছুতে হোঁচট খেয়ে মনে হয় টাল সামলাতে পারেনি। সে যাই হোক, দুজন দুজনকে ধরে সামলে নিল। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে গিয়ে তাকিয়ে আছে বিভাসের দিকে। হঠাৎ বলে উঠল, ‘ আরে বিভাস না ! একিরে... তুই এখানে ? কতদিন পরে দেখা ! তুই তো রানীগঞ্জে থাকতিস ।’
    বিভাস এতক্ষণে চিনতে পেরেছে ভদ্রলোককে। ‘ আ...রে ,সন্তু ! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না । প্রায় তিরিশ বছর পর দেখা হল। সেই উচ্চমাধ্যমিক  পাশ করার পর আর তো দেখা হয়নি। আমি  রানীগঞ্জে থাকতাম। কিন্তু তুই জানলি কি করে ? স্কুল ছাড়ার পর আর তো দেখা হয়নি তোর সঙ্গে। যাই হোক, আমি এখন কলকাতাতেই পোস্টেড। শ্যামবাজারে ওই রামকান্ত বোস স্ট্রীটে থাকি।’ 
    — ‘ তা বিয়ে থা আর করলি না।’
    — ‘ না: , ওটা আর এ জীবনে করার ইচ্ছে নেই। মা চলে গেলে আমি একেবারে মুক্ত পুরুষ।তা, তুই এত খবর পেলি কার কাছে ? ‘
    — ‘ রাখতে হয় বন্ধু , সব খবরই রাখতে হয়। তোমরা আমার খবর রাখ আর নাই রাখ ।’ সন্তু হাসতে হাসতে বলে। 
    — ‘ নে চল , প্রকাশের দোকানে চা খাই .... ‘  
    — ‘ হ্যাঁ  চল ।’
    দুজনে চায়ের দোকানের দিকে পা বাড়ায় উড়ালপুলের কোলে।লোকজন থিক থিক করছে  বৃষ্টিভেজা সাঁঝবেলায়। 
     গরম চায়ের ভাঁড়ে এক চুমুক দিয়ে বিভাস বলল, ‘ তারপর... তোর কি খবর বল। মাসীমা মেশোমশাই কেমন আছেন ? বিয়ে টিয়ে করেছিলি নাকি ?’
    — ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ , একেবারে পরিপূর্ণ ভরভুর জীবন। কোন কিছুর অভাব নেই। এক ছেলে, এক মেয়ে।ছেলে বিদ্যাসাগর কলেজে, ফার্স্ট ইয়ার...কেমিস্ট্রিতে অনার্স। মেয়ে ক্লাস ইলেভেন।’
    বিভাস বগলে ছাতা সামলে চায়ের ভাঁড়ে আর এক চুমুক মারে।বলে,’ বাহ বাহ ... একেবারে সাজানো সংসার। আর মাসীমা মেশোমশাই ? ‘
    — ‘ মা বাবা দুজনেই আছে । মানে, নিজেদের মতো আছে আর কি ...’ সন্তু জবাব দেয়।
    — ‘ নিজেদের মতো মানে ?’ 
    — ‘ ওই আর কি .... বৌ ছেলেমেয়েও তাই.... ‘
    বিভাস আন্দাজ করল সন্ত বৌ বাচ্চা নিয়ে যতই ভরাট সংসার করুক মা বাবার সঙ্গে বাঁধন নিশ্চিত আলগা হয়ে গেছে।যা হয় আর কি। তারা কি সম্মানজনক জীবন যাপন করছেন, না গলগ্রহ হয়ে আছেন সেটা আপাতত: অজানা রইল।
    বিভাস চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক মেরে ভাঁড়টা গামলায় ফেলে দিয়ে বলল, ‘ ও হ্যাঁ, আসল কথাটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি। তুই কোথায় চাকরি করিস ? আর এখন থাকিস কোথায়? আগে তো তোরা মানিকতলার কাছে গড়পার রোডে থাকতিস।’
    — ‘ এখনও ওখানেই থাকি। অমন জায়গা ছেড়ে কোথায় যাব। আমি সেন্ট্রাল এক্সাইজে চাকরি করতাম । ‘
    — ‘ মানে এখন আর করিস না ? এখন তা’লে কোথায় ?’ বিভাস প্রশ্ন করে।
    — ‘ এখন কোথাও নয়। ওসব আস্তে আস্তে জানতে পারবি। আয় না একদিন আমার বাড়ি।’ 
    বলে পকেট থেকে একটা দোমড়ানো মোচড়ানো পার্সোনাল ভিজিটিং কার্ড বার করে বিভাসের দেয়। বিভাস দেখল ওতে নাম 
    ঠিকানা  দেওয়া আছে। বিভাস কার্ডটা পকেটে রাখল।  
    সন্তুর এতক্ষণে চা খাওয়া শেষ হয়েছে। সে ভাঁড়টা ফেলে দিল। পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছল। রুমালটা পরিপাটি ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে রাখল। বিভাসের মনে পড়ে গেল স্কুল জীবনেও সন্তু মুখ মুছে ঠিক এইভাবেই গুছিয়ে রুমালটা ভাঁজ করে পকেটে রাখত।তার মতো গোল্লা পাকিয়ে নয়।
    সন্তু বলল, ‘ চলে আয় একদিন । জমিয়ে গল্প করা যাবে।’
    — বিভাস বলে, ‘ হ্যাঁ যাব একদিন রবিবারে। তুইও আয় একদিন।আমার মোবাইল নাম্বারটা সেভ করে নে। ‘
    — ‘ ও ঠিক আছে, ওসবের দরকার নেই। তুই আয় না আগে, তারপর ওসব হবে ....  আমি এই চত্বরে ঘুরে বেড়াই যদি চেনা জানা পুরনো কারো সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় , যেমন আজ তোর দেখা পেলাম।’

       বাড়ি ফেরার রাস্তায় ফেলে আসা দিনের নানা কথা মনে পড়তে লাগল বিভাসের। স্কুল জীবনে সে আর সন্তু  এত হরিহরআত্মা ছিল যে, ক্লাসের অন্য ছেলেরা তাদের কাপ- ডিশ বলত। তার মনে পড়ে, সন্তু খেতে খুব ভালবাসত। নোনতা, মিষ্টি, টক, ঝাল যে কোনও জিনিস। 
      বাড়ি ফিরে মার কাছে সন্তুর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা বলল বিভাস। বিভাসের মা বললেন, ‘ ওমা, তাই নাকি রে ! সেই ছোটবেলায় দেখেছি। মনে আছে খেতে খুব ভালবাসত। তোরা দুটিতে একেবারে যেন জোড়ের পাখি ছিলি। ওকে একদিন আসতে বললি না কেন ? ‘
      বিভাস বলে, ‘ হ্যাঁ বলব । আমাকেও একদিন যেতে বলেছে।মানিকতলার কাছে থাকে।’
       
        সন্তুকে নেমন্তন্ন করতে হল না। সে নিজেই পরদিন বিকেলবেলা এসে হাজির হল সন্তুদের বাড়ি। সেদিন রবিবার । বিভাস বাড়িতেই ছিল।দরজা খুলে সন্তুকে দেখে অবাক হয়ে গেল। 
    ‘ .... আরে , আয় আয়... হোয়াট এ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ ! 
     বিভাস সন্তুকে জড়িয়ে ধরে ওপরের ঘরে নিয়ে গেল— ‘ এই দেখ মা কে এসেছে.....’ বলতে বলতে ওপরে উঠতে লাগল।বিভাসের মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘ ওমা , কতদিন পরে দেখলাম তোকে .... ‘
       
         তিনজনে চা খেতে বসেছে টেবিলের তিনদিকে। আড়াআড়ি দুপাশে বিভাস আর তার মা। লম্বালম্বি মাঝখানে বসেছে সন্তু। বিভাসের মা বললেন, ‘ তোমার মা বাবা ভাল আছেন তো সন্তু ? কতদিন দেখা হয়নি। একবার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।’
      সন্তু বলে, ‘ আসুন না একদিন আমাদের বাড়ি বিভাসের সঙ্গে।খুব ভাল লাগবে।’  তারপর অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলল, ‘ আমি ছেলেমেয়েদুটোকে খুব ভালবাসতাম। মা বাবাকেও....আমার খুব কাছের বন্ধুবান্ধবদের আমি এখনও খুঁজে বেড়াই। মায়া কিছুতেই কাটাতে পারি না .... ‘
    বিভাস সন্তুর কথার মাঝখানে ঢুকল— ‘ কি অদ্ভুত কথা বলছিস.... ছেলেমেয়েদের ভালবাসতিস... মানে ! এখন আর ভালবাসিস না ? ‘ 
    — ‘ না তা না। এখন আর সেভাবে সম্ভব নয়। ওই যে রামপুরহাটের কাছে.... ও: মাগো !’ , সন্তু বেখাপ্পাভাবে একটু করে বলে আর থেমে যায়।’ .... মানে, ওই দার্জিলিং মেল.... দার্জিলিং মেল....’  আবার থেমে যায় সন্তু। বিভাস আর তার মা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সন্তুর মুখের দিকে। সন্তু বলে, ‘ সি আর ডি জি, মানে চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের তোর একটা ফিজিক্স বই আমার কাছে থেকে গেছে। ওটা ফেরত দেওয়া হয়নি তালেগোলে..... তারপর তো ..... আমাদের বাড়িতে যখন যাবি ফেরত নিয়ে নিস। আমার ছেলেমেয়েরও কাজে লেগেছে বইটা।’ একটানা বলতে থাকে সন্তু। 
    চায়ের কাপ, সিঙ্গাড়া আর রসগোল্লার প্লেট নিমেষের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। বিভাসরা তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সন্তু যেন একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ অনেকদিন হয়ে গেল তো... এখন আর আগের মতো ধীরে সুস্থে খেতে পারি না .... কি করব !’
    বিভাসের মা বললেন , ‘ হ্যাঁ তোমার স্বভাবের অনেক পরিবর্তন হয়েছে ... তা বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অনেক কিছুই তো বদলে যায় ....’
    বিভাস বলল, ‘ না মা, সন্তুর একটা ব্যাপার কিন্তু এখনও একই আছে। হাত মুখ মোছার পর রুমালটা গুছিয়ে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকানো। আমাদের মতো দলা পাকিয়ে নয়। ‘
    এটা শুনে সন্তু কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে গেল, তারপর হঠাৎ হো: হো: হো: করে বিকট আওয়াজে হেসে উঠল। হাসির গমকে ঘরটা যেন কেঁপে উঠল থরথর করে। দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে সন্ধে ছটা বাজল।
     আচমকা থেমে গেল সে হাসি। বাইরে সন্ধের আঁধার নেমে এসেছে।মেঘলা বিকেলে বাড়ির ছাদে যারা দাঁড়িয়ে বা বসে ছিল, আস্তে আস্তে নীচে নেমে যাচ্ছে । ছেলেপুলেরা পাড়ার পার্ক খালি করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছে।
     সন্তু বলল, ‘ সরি, মাসীমা.... মাঝেমাঝে সামলাতে পারিনা। ওই যে রামপুরহাটের কাছে দার্জিলিং মেল....’
     — ‘ দার্জিলিং মেল ... কি ? কি ব্যাপার, খুলে বলতো । হেঁয়ালি করছিস কেন ?’ বিভাস জোর গলায় সওয়াল করে।
    — ‘ না না, বিশেষ কিছুই না.... সব জানতে পারবি .... আয় না একদিন আমাদের বাড়ি । আসলে সবাই মিলে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলাম। কলকাতায় থাকতে মায়ের খুব অম্বল হত।কিন্তু মধুপুরে গিয়ে একদম হয়নি।’
    — ‘ মধুপুরে ! এই যে বললি দার্জিলিং .....’ বিভাস না বলে পারে না।
    — ‘ হ্যাঁ ওই আগে মধুপুর... পরের বছর দার্জিলিং ।ছেলেমেয়ে দুটো খুব আনন্দ করেছিল ওখানে গিয়ে।বাবারও খুব আনন্দ হল ওখানে গিয়ে।মানুষটা কোথাও তো যায়নি কোনদিন।খুব আনন্দ হয়েছিল। মার একদম অম্বল হচ্ছিল না । আমাদের সবার খুব ভাল লাগছিল।খুব মজা হয়েছিল।সেসব আর বলে কি হবে ? যাক , আজ তাহলে উঠি মাসীমা। আবার দেখা হলে খুব ভাল লাগবে। ‘ এইসময়ে বেশ তাগড়া বৃষ্টি শুরু হল।
    — ‘আরে , দাঁড়া দাঁড়া .... বৃষ্টি পড়ছে যে।একটু ওয়েট করে যা।’
    — ‘ না না আর ওয়েট করতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে।আমার কোন অসুবিধে হবে না। ‘ বলে সন্তু এক ঝটকায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
    বিভাস একটা ছাতা নিয়ে তড়িঘড়ি নীচে নেমে এল। এসে বাইরে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যাওয়া রাস্তার এদিক ওদিক তাকিয়ে বিভাস দেখল সন্তু মুহুর্তের মধ্যে কোথায় বৃষ্টির মতো ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেছে।
          
         বিভাস ঠিক করল গড়পার রোডে সন্তুদের বাড়ি একদিন গিয়ে ওদের সবার সঙ্গে দেখা করবে।পুরনো বন্ধু। খোঁজখবর নেওয়া তার কর্ত্তব্য।বাস থেকে নেমে বাঁদিকের রাস্তায় ঢুকল। তারপর ঠিকানা  খুঁজতে লাগল। পথ চলতি মানুষ থেকে  পান সিগারেটের দোকান, হার্ডওয়্যার স্টোর থেকে ফ্ল্যাট বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড কাউকে জিজ্ঞাসা করতে বাকি রাখল না। সকলেই ভ্রু কুঁচকে খানিকক্ষণ সন্তুর ভিজিটিং কার্ডের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর দুপাশে মাথা নাড়ে। বিভাস হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে ওই প্রাচীন রাস্তায় আবছা  স্মৃতির হাত ধরে সোজা হাঁটতে লাগল মানিকতলা বাগজোলা খালের দিকে। এ রাস্তায় সবকিছুই অবশ্য বিলকুল বদলে গেছে। আগের কোন কিছুই আর স্বস্থানে নেই। সেখানে সেজেগুজে মাথা তুলেছে অন্য কিছু।তবু স্মৃতির গাড়ি চেনা সড়কের  গন্ধের টানে তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল বাগজোলা খালের দিকে।তার ভালোরকম মনে আছে সন্তুদের বাড়িটা ছিল বাগজোলা খালের কাছাকাছি।
        হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার আর এক প্রান্তে এসে পৌঁছল বিভাস। এ জায়গাটায় আলো খুব কম। সন্ধে হয়ে গেছে । তবু স্ট্রীট লাইটগুলো জ্বলছে না। ঘরবাড়ি, দোকানপাটের সারি ক্রমশ: ফাঁকা হয়ে গেছে। আর একটু এগোবার পর ছবির মতো ভেসে উঠতে লাগল ছোট ছোট জলা, আগাছা আর ঝোপঝাড় । মাঝে মাঝে  পরিত্যক্ত বয়স্ক ভাঙাচোরা বাড়ি। বট অশ্বথ্থের শিকড় পাকড়ে ধরেছে বুড়ো বাড়ির শরীরগুলো।আলো খুব কম।ছমছমে পরিবেশ।পরিবেশ আচমকা কেমন বদলে গেল। ঝিঁঝির ডাকে বাতাসে কাঁপন  শুরু হল চারপাশে। খালের ধারে একটা বিশাল বটগাছ। এলিয়ে পড়া অন্ধকারে সড়সড় করে হাওয়া বইছে বটের পাতাপত্তরের মধ্যে দিয়ে। এরকম তো ছিল না আগে। বিভাসের যেন ঘোর লাগে। তার মনে হল আর এগিয়ে কাজ নেই। এখান থেকে ফিরে যাওয়াই ভাল।কিন্তু কে যেন তাকে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বিভাস যেন ঘুমের ঘোরে হাঁটতে লাগল। তার ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে কিছু যেন আর নেই । এখানে কোন জন মনিষ্যি নেই। ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আবহ একেবারে শুনশান,  নিস্তব্ধ। আর আছে অবিরাম বয়ে যাওয়া বাতাসের সড়সড় আওয়াজ।
       হাঁটতে হাঁটতে বিভাস এক জায়গায় পৌঁছে দেখল এগোবার আর রাস্তা নেই। সামনে একটা খাল। খালের কালো জল। একধারে ভাসছে একটা বাঁধা নৌকো। ঘোর লাগা অবস্থায় বিভাস খালের ধারে গিয়ে দাঁড়াল।তার পিছনে একপাল কুকুর ওই অন্ধকারের মধ্যে বিকট কর্কশ চিৎকার শুরু করল আচমকা।
       বিভাস কিছু দেখছে না বা শুনছে না। সে শুধু ভাবছে সন্তুদের বাড়িটার কথা।সে বাড়িটা সে খুঁজে পাচ্ছে না কেন ! বাচ্চাদের মতো তার যেন জেদ চেপে গেল।বাড়িটা সে খুঁজে বার করবেই।সন্তুর মা ছিল, বাবা ছিল... বৌ, বাচ্চা .... সবার সঙ্গে দেখা করবে। কত কত দিন কেটে গেছে। ওদের কাছে যাবে। নিশ্চয়ই যাবে। কিন্তু ওদের কাছে পৌঁছবার রাস্তা কই ? ঢালা আঁধারে বিবশ ব্যাকুল বিভাস যেন ঘুমের ঘোরে এক শীতল স্বপ্নে জড়িয়ে খালের কালো জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
      এলোমেলো জোলো হাওয়া বইছে । দাঁড়িয়ে  থাকতে থাকতে মনে হল কে যেন পিঠে হাত দিয়েছে। পাশে কে একটা এসে দাঁড়িয়েছে। বিভাস ডানদিকে মুখ ঘোরাল। অন্ধকারেও পরিষ্কার দেখা গেল সন্তু তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সন্তু বিভাসের হাত ধরে বলল, ‘ নে চল.... আমাদের বাড়ি চল .... ‘।
         বিভাসকে বাঁদিকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ইঁট বার করা আগাছায় ভরা দোতলা বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে সন্তু বলল, ‘ ওই দেখ .... আমাদের বাড়ি.... জানলায় বাড়ির সকলে দাঁড়িয়ে আছে।’  বিভাস দেখল অন্ধকার জানলায় সন্তুর মা বাবা স্ত্রী ছেলেমেয়ে সবাইয়ের মুখ দেখা যাচ্ছে। কারো মুখই ভালভাবে বোঝা যাচ্ছে না।সকলের সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে শুধু। বিভাসকে দেখে ওরা হাসছে সবাই। 
       সন্তু বিভাসের হাত ধরে বাড়ির দরজার সামনে নিয়ে এল। ইঁটের পাঁজরা বেরনো পাল্লাহীন প্রবেশ দ্বার। ভেতরে কোন বুনো গাছের ডাল ঝুলছে। অন্ধকার। সন্তু বিভাসের হাতটা ধরে আছে। বিভাসের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে সন্তুর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালাতে চাইল। কিন্তু আটকে গেল খোঁটায় বাঁধা গরুর মতো।বিভাস প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল সন্তুর হাত ছাড়াবার জন্য। সন্তুর হাতের সঙ্গে তার হাত যেন কে শক্তভাবে বেঁধে দিয়েছে। সন্তুর গলা শোনা গেল— ‘ বিভাস... তুই আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছিস ! আমরা কবেকার বন্ধু বল ..... সেই স্কুল থেকে ...... সি আর ডি জি-র ফিজিক্স বইটা নিবি না ? ....’
      বিভাস আপ্রাণ টানতে লাগল নিজের হাত। তার বুকের ধুকপুকুনি এত বেড়ে গেছে, মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ....মাথাটা অবশ লাগছে।
      অন্ধকার বাড়ির সামনে, অন্ধকার রাস্তায় ধপ করে পড়ে গেল তার অচেতন দেহ।

       ভোরবেলায় জগিং করতে বেরনো তিনটে ছেলে একটা লোককে খালের ধারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেল । পকেট থেকে   মোবাইল বার করে কল দিল পাড়ার ক্লাব সেক্রেটারিকে।

       লোক্যাল থানার ও সি, হাসপাতালের বেডে শোওয়া বিভাসের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বয়ান নিলেন।মাথার টুপিটা খুলে একটা গভীর শ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, ‘ এই নিয়ে থার্ড কেস। আপনি যেখানে গিয়েছিলেন সেখানটা একেবারে ফাঁকা। পুরনো বা নতুন কোন বাড়ি ঘরই ওখানে নেই। আপনার বাল্য বন্ধু সন্তু মিত্র ওই ওপাশে যে মোটর গ্যারাজটা আছে, তার পাশের বাড়িটায় থাকত। ওদের ফ্যামিলির সবাই একসঙ্গে মারা  যায় বছর দুই আগে রামপুরহাটের কাছে একটা সাঙ্ঘাতিক ট্রেন দুর্ঘটনায়। যতদূর মনে পড়ছে দার্জিলিং মেলে। 
       
      এরপর মাস তিনেক কেটে গেছে। হাবড়ায় বিভাসের একটা কাজ ছিল। কাজ সেরে ডাউন বনগাঁ লোক্যালে শিয়ালদায় এসে নামল।
       উড়াল পুলের নীচে একটা দোকান থেকে দুটো গামছা কিনল বিভাস। পয়সা মিটিয়ে পিছন ঘুরতেই সামনে একজনকে দেখে চমকে উঠল সে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরিপাটি করে রুমাল ভাঁজ করছে সন্তু মিত্র। বিভাসের দিকে তাকিয়ে সরলভাবে হেসে বলল, ‘ চল না... প্রকাশের দোকানে চা খাই ... দারুন বানায়। ‘
       বিভাস ভয় পেল না। বুঝতে পারল এ মাটির মায়া কাটানো কত কঠিন। বলল, ‘ হ্যাঁ চল.... তবে ফিজিক্স বইটার আমার আর দরকার নেই....।’

    ************************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন