এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • লাল মাটির পাগলামি

    হারামির হাতবাক্স লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ৩৯ বার পঠিত
  • শান্তিনিকেতনের লাল মাটি—না, মাটি বলা ভুল—সেই রক্তরাগা ধুলো, যেন কোনো প্রাচীন দেবতার চূর্ণ হয়ে যাওয়া হৃদয়ের গুঁড়ো, সেই ধুলোর প্রতিটি কণায় মিশে ছিল এক বিদ্রোহী নেশা। অবাধ্যতা? না, অবাধ্যতা শব্দটা অতি সভ্য, অতি নাগরিক। এ ছিল নিরুদ্দেশের টান, ছিল সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার এক উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা। সেই লাল ধুলোয় পা রেখেই মনটা হুস করে উড়ে যেত—কোথায়? কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নয়, উড়ে যেত শুধু দূরে, অনেক দূরে, যেখানে কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই, শুধু আছে এক অসীম শূন্যতা।
     
    বোলপুরের সোনাঝুরি। নামটাই যেন এক স্বপ্নের টুকরো। সেখানকার বাউলের আখড়া—আখড়া বললে ভুল হবে, ওটা ছিল এক জাদুঘর, এক পাগলখানা, এক মন্দির, এক শ্মশান, সবকিছু একসাথে। কতরাত সেখানে কাটিয়েছি, কতবার নিজেকে হারিয়েছি সেই অন্ধকারে, সেই আগুনের লেলিহান শিখায়, সেই ধোঁয়ার ঘূর্ণিতে—গুনতে গেলে হিসেব গোলমাল হয়ে যায়। সময় সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে থাকত, নাকি সময়ই সেখানে ছিল না? 
     
    আগুনের কুণ্ডলী জ্বলত মাঝখানে। কাঠের টুকরো, শুকনো পাতা, কখনো গোবর-উপলে তৈরি জ্বালানি—সব পুড়ে যেত, ছাই হয়ে যেত, কিন্তু আগুনটা থাকত। সেই আগুনের চারপাশে বসে থাকতাম আমরা, কয়েকজন ভবঘুরে, কয়েকজন পাগল, কয়েকজন সাধক, আর কয়েকজন সাধারণ মানুষ যারা অসাধারণ হওয়ার স্বপ্ন দেখত। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠত আকাশে, সর্পিল গতিতে, যেন কোনো অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে স্বর্গে। কিন্তু স্বর্গ কোথায়? স্বর্গ তো ছিল সেখানেই, সেই মাটিতে, সেই ধোঁয়ায়, সেই তামাকের গন্ধে।
     
    তামাক। গাঁজা। চরস। নাম যা-ই হোক, সেই গন্ধটা ছিল এক গূঢ় দর্শনের বাহক। সেই গন্ধ নাকে ঢুকলেই চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যেত, কিন্তু মনের ভেতরটা হয়ে উঠত স্বচ্ছ, একদম জলের মতো পরিষ্কার। কী অদ্ভুত! বাইরে অন্ধকার, কিন্তু ভেতরে আলো। বাইরে ধোঁয়া, কিন্তু ভেতরে স্বচ্ছতা। এই যে উল্টোপাল্টা জগৎ, এই যে বিপরীতের মিলন, এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সেই অবিনাশী দর্শন। জীবন আর মৃত্যু এক, সুখ আর দুঃখ এক, আমি আর তুমি এক—এই সব কথা ওরা মুখে বলত না, কিন্তু বেঁচে থাকত এভাবেই।
     
    কাক ডাকা ভোর। কুয়াশা। মাঠের কিনারা। এই ছবিটা চোখের পাতায় আঁকা আছে, মুছবে না কোনোদিন। শীতের সকাল, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, কিন্তু আমরা বসে আছি খোলা আকাশের নিচে। কুয়াশা চুঁইয়ে আসছে মাঠের ওপর দিয়ে, সাদা চাদরের মতো বিছিয়ে দিচ্ছে সব জায়গায়। আর সেই কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল গান—বাউল গান, যার কথাগুলো ছিল রহস্যময়, সুরগুলো ছিল হৃদয়বিদারক।
     
    "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়..."
     
    "আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে..."
     
    "ও আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে..."
     
    এই গানগুলো শুধু কানে ঢুকত না, শরীর চিরে ঢুকে পড়ত রক্তের ভেতর। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর ছিল এক-একটা তীরের মতো, যা বিঁধে যেত বুকের গভীরে। আর সেই তীরের ফলায় লেগে থাকত বিষ—মিষ্টি বিষ, যা মারে না, কিন্তু বদলে দেয় চিরকালের জন্য।
     
    কী অবলীলায় ওরা জীবনের নশ্বরতাকে মেনে নিত! মৃত্যু নিয়ে ওদের কোনো ভয় ছিল না, দুশ্চিন্তা ছিল না। বাঁশির টানে ওরা উড়িয়ে দিত সব চিন্তা, সব দুঃখ, সব আতঙ্ক। বাঁশি বাজত, আর তার সাথে সাথে উড়ে যেত জীবনের সব বোঝা। এত সহজ! এত সরল! কিন্তু আমি তখন বুঝিনি। তখন ভাবতাম, এসব পাগলামি, এসব ভণ্ডামি। কিন্তু আজ, এত বছর পরে, এই হাড়কাঁপানো নিঃসঙ্গতায় বসে, হঠাৎ টের পাই—ওরাই ঠিক ছিল, আমিই ভুল ছিলাম।
     
    জীবনটা আসলে এক অদ্ভুত ভবঘুরে খেলা। না কোনো শুরু, না কোনো শেষ। শুধু চলতে থাকা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে। কোথাও থামা নেই, কোথাও বিশ্রাম নেই। আর এই চলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সব রহস্য, সব সত্য, সব সুন্দর।
     
    বুকের পাঁজরে এখন সেই একতারাটা বেজে ওঠে। অনবরত। রাতে, দিনে, ঘুমে, জাগরণে—সবসময়। একটা তার, একটা সুর, কিন্তু কত গভীর, কত ব্যাপক! সেই তারে ঝংকার তুললেই সব ফিরে আসে—সোনাঝুরির সেই রাত, সেই আগুন, সেই ধোঁয়া, সেই তামাকের গন্ধ, সেই কুয়াশা, সেই গান। আর সেই বাউলদের মুখ, যাদের চোখে ছিল এক অসীম শান্তি, যাদের হাসিতে ছিল এক গভীর জ্ঞানের প্রতিফলন।
     
    দেহতত্ত্ব। শব্দটা শুনতে জটিল লাগে, কিন্তু ওরা যেভাবে বলত, যেভাবে বাঁচত, তাতে সব সহজ হয়ে যেত। দেহই ব্রহ্মাণ্ড, দেহই মন্দির, দেহেই আছে সব দেবতা, সব তীর্থ। বাইরে খুঁজতে যাওয়ার কী দরকার? ভেতরে তাকাও, নিজের ভেতরে, আর পেয়ে যাবে সব উত্তর। কত সহজ কথা, কিন্তু কত কঠিন করা! কারণ নিজের ভেতরে তাকাতে গেলে সাহস লাগে, নিজেকে নগ্ন করতে হয়, সব মুখোশ খুলে ফেলতে হয়।
     
    উদাসীন বেঁচে থাকা। এই শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে পুরো বাউল দর্শন। উদাসীন মানে উদাস নয়, উদাসীন মানে অনাসক্ত। জীবনে থাকা, কিন্তু জীবনের বন্ধনে না জড়ানো। খাওয়া, কিন্তু খাবারের গোলাম না হওয়া। ভালোবাসা, কিন্তু ভালোবাসার শিকলে না বাঁধা পড়া। এই যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য, এই যে নাচতে নাচতে পড়ে না যাওয়া, এটাই হলো আসল শিল্প, আসল জীবন।
     
    আজ সেই দেহতত্ত্ব, সেই উদাসীন বেঁচে থাকা আমার মজ্জায় বসত গড়েছে। হাড়ের ভেতর ঢুকে গেছে, রক্তে মিশে গেছে। এখন আর আলাদা করা যায় না—কোথায় আমি শেষ, কোথায় বাউলিয়ানা শুরু। হয়ে গেছি এক, অভেদ।
     
    ফেরার পথ? কোথায় ফেরার পথ? কোথায় ফিরব? যে জায়গা থেকে এসেছিলাম, সেটাও তো ছিল এক অস্থায়ী আস্তানা। আর যেখানে আছি, সেটাও তো আজ, কাল চলে যাব। তাহলে ফেরা কীসের? ফেরার জন্য তো একটা স্থায়ী ঘর দরকার, একটা শিকড় দরকার। কিন্তু বাউল তো শিকড়হীন, শিকড়বিচ্যুত, সে তো আকাশের পাখি, হাওয়ার সাথী।
     
    শুধু রয়ে যায় এক অনন্ত বাউলিয়ানা। এটা কোনো মতবাদ নয়, কোনো ধর্ম নয়, কোনো দর্শন নয়—এটা এক জীবনযাপনের পদ্ধতি, এক শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ, এক হৃদয়স্পন্দনের তাল। যে একবার এই পথে পা রাখে, সে আর ফিরতে পারে না। ফিরতে চায়ও না। কারণ এই পথেই আছে সব মুক্তি, সব স্বাধীনতা, সব আনন্দ।
     
    শান্তিনিকেতনের সেই লাল ধুলো এখনও উড়ছে। বোলপুরের সেই আগুন এখনও জ্বলছে। সেই একতারা এখনও বাজছে। আর আমি? আমি এখন শুধু এক ভবঘুরে, এক বাউল, যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার মনের মানুষকে, যে জানে এই খোঁজার কোনো শেষ নেই, কিন্তু এই খোঁজাটাই শেষ কথা।
     
    রক্তে মিশে গেছে সেই গান, হাড়ে গেঁথে গেছে সেই দর্শন। এখন আর আলাদা নেই আমি আর বাউলিয়ানা। আমিই বাউলিয়ানা, বাউলিয়ানাই আমি।
     
    অনন্ত এই যাত্রা, অসীম এই পথ।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন