গতকাল কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্সটিটিউট অফ কালচারে ময়মনসিংহ প্রাক্তনীদের বাৎসরিক সভায় গিয়েছিলাম। স্বামী সুপর্ণানন্দজী ও অন্য অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রাক্তনীরা বিশেষ সম্মান দিলেন মমতাশঙ্কর ও চন্দ্রোদয় ঘোষকে -- দুজনেরই আদি বাড়ি ময়মনসিংহ। আমার দাদা ডঃ দেবদত্ত চৌধুরী কে (ছবিতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে) সংস্থা তার আজীবন সেবার জন্যে পুরস্কার দিল। বছরের পর বছর, উনি বিনা পয়সায় অথবা খুবই অল্প টাকায় প্রচুর রোগী দেখেন।
স্বামী বিবেকানন্দের সহনশীলতা নিয়ে বক্তব্য রাখলেন সুপর্ণানন্দজী এবং শ্রী স্বপন মুখোপাধ্যায়। স্বামীজি যে ধর্মের বিষয়ে কতখানি উদার ও সহনশীল ছিলেন সেই নিয়ে আমি দু চার কথা বললাম। এই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত উক্তির কথা মনে করিয়ে দিলাম "আমি অতীতের সকল ধর্ম গ্রহণ করি, এবং তাদের সাথে উপাসনা করি; আমি প্রত্যেকের সাথে ঈশ্বরের উপাসনা করি, যে কোনও রূপে তারা তাঁকে উপাসনা করুক।"
স্বামীজি তাঁর ভারতবর্ষের তীর্থের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই বুঝেছিলেন "যত মত তত পথ" এর সারমর্ম ও গুরুত্ব। হিন্দু মুসলমানদের পার্থক্য নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই , কিন্তু হিন্দুদের নিজেদের মধ্যেই আঞ্চলিক বিভিন্নতা খুবই চমকপ্রদ। তা সত্ত্বেও আমরা যে ঝগড়া লড়াই না করে পরস্পরের বিভিন্নতা মেনে নিয়েছি এটাই হিন্দু ধর্মের সহনশীলতার পরিচয়। ঔদার্য না থাকলে ভারতে ও হিন্দু ধর্মের "বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য নীতির" জয় হত না। এই মূল সত্য স্বামীজীর মতন মহাপুরুষেরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
আমি একটি উদাহরণ দিলাম -- নবরাত্রি উৎসব। অদ্ভুত তার বৈচিত্র্য। এই নবরাত্রির সময় ভারতের উত্তর অঞ্চলে মানুষ নিরামিষ খায় , নানান সংযম পালন করে আবার প্রচুর লোক উপবাস রাখে। কিন্তু বাঙালিরা একদম বিপরীত। কয়েকটি গোঁড়া পরিবার কিছু নিয়ম বা ব্রত পালন করলেও, সাধারণ লোকেরা দুর্গাপুজোর সময় কব্জি ডুবিয়ে মাছ-মাংস খেতে ব্যস্ত থাকে। অন্য দিকে, নবরাত্রির সময়েই রাজস্থানের রাজপুতরা এবং দেশের অনেক রাজপরিবার আর যোদ্ধা-গোষ্ঠীও কুলদেবীর কাছে মোষ বা ছাগল বলি দেন। হিমালয়ের পাদদেশে এবং পূর্ব ভারতে অনেক জায়গায় মোষ বলি প্রচলিত।
আবার নবরাত্রি উৎসবের একটা বড় উদ্দেশ্য হল সুফসলের প্রার্থনা। মহারাষ্ট্রে এই উৎসব কে ঘটস্থাপনা বলা হয়। একটি জলপূর্ণ মাটির কলসি স্থাপন করা হয় চার পাশে এক তাল মাটির মধ্যে । সেই মাটিতে হরেক শস্যদানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে এই ন’দিনে সেগুলি অঙ্কুরিত হয়। গুজরাতিরা এই অনুষ্ঠানকে ‘গরবা’ বা গর্ভ নাম দেন। তাঁদের প্রসিদ্ধ ‘গরবা’ নাচও হয় এই মাটির কলসিকে ঘিরেই। গোয়ায় এই পাত্র সাধারণত তামা দিয়ে তৈরি হয় এবং এই সময়েই নানান গোষ্ঠীর মানুষ শস্য রোপণের উৎসব করেন। বাংলায় সপ্তমীর দিন নবপত্রিকার (কলা বউয়ের) স্নান ও স্থাপন করা হয়, মা দুর্গার পাদদেশে।
দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে এই উৎসবের সময় একটা অদ্ভুত প্রথা চলে। কাঠের পাটাতনের ওপর ছোট্ট ছোট্ট কাঠের পুতুল সাজিয়ে রাখা হয়। এই নয়রাত্রি কে তিন ভাগ করে সরস্বতী, পার্বতী আর লক্ষ্মীর পুজো হয়। অন্ধ্রপ্রদেশে আর মহীশূরে এই উৎসব পালন করা হয় পাণ্ডবদের যুদ্ধজয়ের উদ্যাপনের লগ্ন।
সুতরাং হিন্দু ধর্মের কোনও একটি প্রথাকে বেশী প্রাধান্য দেওয়া হয় না বরং সকলকে মিলিয়ে চলতে শেখায়। শান্তিপূর্ণ সহবাস এবং সহনশীলতা , এ ছাড়া ভারতের ধর্ম যেমন চলত না, বর্তমানে বহু ধর্মীয় ভারত ও সারা বিশ্বে এই একই উদারতার প্রয়োজন।