এই পোস্টটা কেবল রঞ্জনবাবুর (২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১৩) জন্য। আগেই এ ব্যাপারে ফেসবুকে লিখেছি, সেটাই সামান্য মডিফায়েড আকারে রইল।
বঙ্কিম নিজে লিখেছিলেন-
সপ্তকোটীকণ্ঠ-কল-কলনিনাদকরলে,
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈধৃতখরকরবালে
(বঙ্কিম রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, ত্রয়োদশ প্রকাশ, কলকাতা, সাহিত্য সংসদ, ১৩৯৬, পৃ. ৬৭৪)
তখন (১৮৭২-এর আদমসুমারি) সুবে বাংলায় জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি। বঙ্কিম গানটা লিখেছিলেন বাংলার প্রেক্ষাপটে, সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে নয়। ওই কারণেই 'সপ্তকোটীকণ্ঠ'।
১৯০৫ সালে কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে এ গানে প্রথম শব্দ পরিবর্তন করেন সরলা দেবী। 'সপ্তকোটীকণ্ঠ' এবং 'দ্বিসপ্তকোটীভুজ' যথাক্রমে 'ত্রিংশকোটীকণ্ঠ' ও 'দ্বিত্রিংশকোটীভুজ'-এ পরিবর্তিত হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় রকমের পরিবর্তন, যদিও কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে আপত্তি করেননি। এমনকি ওই অধিবেশনে সরলা দেবী পুরো গানটিও গাননি। আপত্তি তা নিয়েও হয়নি। শুধু তা-ই নয়, আপনি যদি ওঙ্কারনাথ ঠাকুর বা দিলীপ রায়ের কণ্ঠে গানটি শোনেন, তাহলে 'ত্রিংশকোটীকণ্ঠ'-ই শুনতে পাবেন।
কিন্তু কখন যে গানটাকে সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে 'কোটি কোটি' করা হল, খোদায় মালুম। বিজেপির লোকজন এটা করেনি, কিন্তু সরকারি ভার্সনে এই কথাগুলোকে তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। এবং এটা কেবল হিন্দি বলয়েই হচ্ছে না, এখানেও হচ্ছে।
এই সুবাদে রঞ্জনবাবু আরও একটা মারাত্মক প্রমাদের ব্যাপার এড়িয়ে গেছেন। সেটা হল, ঠিক এর পরের লাইনেই আছে 'অবলা কেন মা এত বলে!' আনন্দমঠ উপন্যাসটি যখন বঙ্গদর্শনে প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন এই ছত্রটি ছিল 'কে বলে মা তুমি অবলে!' গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশিত হওয়ার পরে উপন্যাসটির প্রথম দুটি সংস্করণেও এই পাঠ ছিল। সম্ভবত তৃতীয় সংস্করণে বঙ্কিম নিজে এটাকে পরিবর্তন করে 'অবলা কেন মা এত বলে' করেন। এখন প্রশ্ন হল, স্বয়ং বঙ্কিম যে পাঠটি বর্জন করেছিলেন, সেটিকে আবার ফিরিয়ে আনার কী যুক্তি? এটাও বিজেপি করেনি এবং অনেকেই রেকর্ডে 'কে বলে মা তুমি অবলে' গেয়েছেন।
কাজেই গানটার তিনটি ছত্রে কাঁচি চলেছে এবং নয়া ফরমান জারি হওয়ার অনেক আগে থেকেই এই কাঁচি চালানো হয়েছে। বিজেপি এই কাঁচি চালানোয় সরকারি সিলমোহরটি দিয়েছে।
আর আপনি খুব দুষ্টু! তাই দাবি তুলেছেন "জনগণমন রাষ্ট্রীয় স্তোত্রের সবকটি স্তবক গাওয়া হোক। বন্দে মাতরমের মত।"
ওরে বাবা, যে কারণে খণ্ডিত বন্দে মাতরম্ পুরোটা গাওয়ার বায়নাক্কা, অবিকল একই কারণে জনগণকে খণ্ডিত করে রাখা।
//অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী
পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে
প্রেমহার হয় গাঁথা।// হজম হয় নাকি? মোচোমান আছে না?
তবে বন্দে মাতরমে কাঁচি চালানোর অজুহাতে জনগণ থেকে সিন্ধু যে কবে বাদ পড়ে যাবে, কে জানে।
আপনার রেফারেন্সের জন্য বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত গানটির বিতর্কিত অংশের ছবি দিলাম।