আজ আমার যা মনে হচ্ছে
২০২৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই সময়ে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—একটি নতুন সম্পর্কের মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু এই সম্পর্ককে শুধু বর্তমানের রাজনৈতিক-সামরিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদেরকে ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে যেতে হবে। কীভাবে ৭৫ বছর আগে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি চীন আজ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তির একটিতে পরিণত হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এই নিবন্ধে আমরা সেই ঐতিহাসিক যাত্রা, চীনা অর্থনৈতিক মডেলের স্বকীয়তা এবং এর বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর চীন: ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। তার শিল্পোৎপাদন, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে চীন ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। জাপানি আগ্রাসন (১৯৩০-এর দশক থেকে), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস এবং ১৯৪৫-১৯৪৯ সালের গৃহযুদ্ধ—এই সবকিছু চীনকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।
মাও সে তুং নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং অষ্টম রুট আর্মি অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলোতে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিজয়ের পরও চীনের সামনে ছিল ভয়ানক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিস্ট বিজয়কে শত্রুতার চোখে দেখেছিল। ফলে চীনকে কোনো মার্শাল প্ল্যানের মতো পুনর্গঠন সাহায্য দেওয়া হয়নি। ইউরোপ এবং জাপান পেয়েছিল বিপুল সাহায্য, কিন্তু চীন পায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত কুয়োমিনতাং বাহিনীকে সমর্থন করে তাইওয়ান ইস্যু তৈরি করে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে চীন ছিল আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে বুঝতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলো আশা করেছিল যে, তাদের পুঁজিবাদী মডেল এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে উন্নয়নের পথ দেখাবে। কিন্তু চীন সেই মডেল অনুসরণ করেনি। কোনো বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই, শত্রুতার মধ্যে দাঁড়িয়ে চীন নিজস্ব পথ তৈরি করেছে।
চীনা অর্থনৈতিক মডেল: একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা
চীনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো তার অর্থনৈতিক সংগঠন। এটি নিছক পশ্চিমা বেসরকারি পুঁজিবাদী অর্থনীতি নয়, আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনও নয়। চীন একটি হাইব্রিড মডেল অনুসরণ করেছে। প্রায় অর্ধেক অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ (State-Owned Enterprises) দ্বারা পরিচালিত, অন্য অর্ধেক বেসরকারি পুঁজিবাদী উদ্যোগ—চীনা এবং বিদেশি উভয়ের দ্বারা।
এই হাইব্রিডের উপর রয়েছে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীনা সরকার অর্থনীতির অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ করে—বাণিজ্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায়। আর সরকারের উপরে রয়েছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CCP)। পার্টি সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিশ্বাসী, মার্কসবাদী দর্শন অনুসরণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা নিজেদের অর্থনীতিকে “চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র” বলে অভিহিত করে।
এই ব্যবস্থার স্বকীয়তা হলো—পার্টি-সরকার-অর্থনীতির সমন্বয়। পার্টি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে, সরকার বাস্তবায়ন করে এবং বাজার শক্তিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করে। ফলে চীন তিন-চার দশকে এমন উন্নয়ন অর্জন করেছে যা পশ্চিমা ইউরোপ তিন-চার শতাব্দিতে করেছে। ১৯৭৮ সালের সংস্কার-উন্মুক্তকরণ নীতির পর থেকে চীনের জিডিপি বৃদ্ধির হার দীর্ঘদিন ধরে ৫-১০ শতাংশের মধ্যে ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান হার ২ শতাংশের আশেপাশে।
এই মডেলের সাফল্য অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আকৃষ্ট করছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ চীনের মডেল থেকে শিক্ষা নিতে চায়—কীভাবে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন সম্ভব। চীন বিশ্বের কারখানায় পরিণত হয়েছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করছে।
মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বিপরীতমুখীতা
চীনের অভিজ্ঞতায় একটি গভীর বৌদ্ধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্কসবাদ ঐতিহাসিকভাবে পুঁজিবাদের সবচেয়ে তীব্র সমালোচক। কার্ল মার্কস পুঁজিবাদকে শ্রমিক-মালিকের শোষণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছিলেন এবং তার অতিক্রমের পথ দেখিয়েছিলেন। অথচ বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় (যেখানে নিয়োগকর্তা-নিয়োগপ্রাপ্তির সম্পর্ক সর্বজনীন) সবচেয়ে দ্রুত এবং সফল উন্নয়ন ঘটিয়েছে একটি মার্কসবাদী দলের নেতৃত্বাধীন দেশ।
চীন পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে থেকেই তার লক্ষ্য অর্জন করেছে, কিন্তু পার্টির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য বজায় রেখেছে। তারা বলে, তারা এখনো সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং ধীরে ধীরে উন্নত সমাজতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। এই বাস্তবতা পশ্চিমা অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। পশ্চিমা মডেল ছাড়াও দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব—এই প্রমাণ চীন দিয়েছে।
অন্য কোনো দেশ—মালয়েশিয়া, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা বা ব্রাজিল—এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। চীনের সাফল্য দেখিয়ে দেয় যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাজার-রাষ্ট্রের সমন্বয় অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ
চীনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ কারণ এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকও। দক্ষিণ চীন সাগরে নৌবহরের উপস্থিতি, প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বৃদ্ধি—সবকিছুই এই উত্থানের ফল। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং শীঘ্রই প্রথম হয়ে যাবে।
তবে চীনেরও সমস্যা আছে—জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, ঋণের বোঝা, আঞ্চলিক অসমতা, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি। মার্কসবাদ অনুসারে সংগ্রাম কখনো থামে না। চীন ৫০ বছর আগে যা ছিল, আজ তা নয়; ৫০ বছর পরও অন্যরকম হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই বাস্তবতা বুঝে নেওয়া। আদর্শগত যুদ্ধের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার। চীনের উত্থান বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে, একক মডেল নয়, বৈচিত্র্যময় উন্নয়ন পথ সম্ভব।
চীনের চ্যালেঞ্জ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য। এটি আমাদেরকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—উন্নয়নের সঠিক পথ কী? রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত? বাজার এবং পরিকল্পনার সমন্বয় কীভাবে সম্ভব? চীন দেখিয়েছে যে, দারিদ্র্য থেকে সমৃদ্ধির পথ দ্রুত অতিক্রম করা যায় যদি জাতীয় সংকল্প, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বুদ্ধিদীপ্ত নীতি থাকে।
ট্রাম্পের বেইজিং সফর এই নতুন বাস্তবতার স্বীকৃতি। আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে ঐতিহাসিক সত্যকে বুঝতে হবে। চীনের অভিজ্ঞতা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা এই দুই মহাশক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার মিশ্রণে গড়ে উঠবে।