শিশমহলে বিকেলের বর্ণশোভা দেখতে গিয়েছিলেন জাহানারা বেগম। অথচ দেখলেন, তাঁর বোন রোশনারা বেগম ক্রীতদাস সহযোগে জীবনবসন্তের শোভা অনুধাবনে রত। ঘৃণায় বিকৃত হলো জ্যেষ্ঠার দেহমন। কই, শাহজাহানের বহুগমনকালে তো পিতার প্রতি মন বিমুখ হলো না তার? তাই অবশ্য ছিলো রীতি রেওয়াজ সেকালের। একালেরও নয় কি? কে জানে! একবিংশ শতাব্দীর বিকেল অবশ্য তেমনি শিশমহলে নামে না। গৃহস্থের জানালায় সুতির শাড়িটি তুলে নিয়ে যাওয়ার ধরণ তার। এমন একটি আলো, যাতে ঘরের প্রতিটি তুচ্ছ জিনিস মনে হয় সুশ্রী। আবার আঁধার নামলে, আলোর ঘষাটে দ্যুতিতে তা নিজের স্বরূপ নিয়ে দাঁড়াবে। তবু বৈকালিক প্রসাধনটুকু করে সমস্ত আসবাব, প্রকৃতি, মানুষও। দূর থেকে দেখলে সৌন্দর্য্য পাওয়া যায় সবেতেই, কাছে গেলেই পর্দাফাঁস। বলেছিলো এইকথা অনেকেই, তবে কুশ্রীতাকে বেছে নিয়ে প্রিয়ার চরম দুর্দিনে কে আর বলতে পারে, "আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা।" সবাই তো আর সন্ন্যাসী উপগুপ্ত নয়। তবু দিনান্তের মলিনতায় যে মুমূর্ষ সৌন্দর্য্যের খোঁজ করে মরি, 'ঘরে -বাইরে'র সন্দীপের কাছে তা নেহাৎই অবজ্ঞার বস্তু। তার মতে এমন জিনিস ওই নির্জীব নিখিলেশের ভালো লাগতে পারে, রক্ত-মাংসের দুনিয়ায় থাকা সন্দীপের নয়। এই দ্যাখো, কথার পিঠে কথা। রক্ত-মাংস বললেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের সেই ঝিল্লিকে মনে পড়ে। যাই হোক, বিকেলের রঙমিলন্তি শেষ হতে হতে যে স্তবক, যে সাজানো আলপনা রেখে যায় সন্ধ্যার কালো আঁচল মুছিয়ে দেবার জন্য, তা দেখে মনে পড়ে আমার বন্ধুর বাড়ির রঙিন কাঁচের শার্সির কথা। পুরোনো ধাঁচের বাড়িতে লম্বাটে জানালা। খড়খড়ি টেনে দুইপাল্লায় খোলা যায়। উপরে লাল, বাসন্তী হলুদ, নীল আর সবুজ কাঁচের পরতে পরতে সাজানো শার্সি। ওর মজার খেলা ছিলো ওই রঙিন কাঁচে চোখ রেখে বাইরেটাকে দেখা। দোষের কী আছে? যেকোনো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে গিয়ে যদি আমরা নিজস্ব রঙ প্রয়োগ করি, ও ধূসর বাস্তবটাকে কাঁচের শার্সি দিয়ে কেন দেখতে পারে না? জানুয়ারির শীতুড়ে ভোর। হলুদ-রঙা শার্সিটায় চুপিচুপি চোখ রেখেছি। আমার গায়ে মায়ের শাল জড়ানো, ওর পরণে হালকা গোলাপী রঙের সোয়েটার। ওর ছোটোবেলা। সেই শৈশবের মিঠে দুধেল গন্ধটা এখনো ওকে জড়িয়ে ধরলে পাওয়া যায়। একটি শোভাযাত্রা আসে। ঘোড়ার গাড়ির টগবগ শব্দে জনপথ সচকিত, ফুল আর মালায় শোভিত হয়ে যুবকরা চলেছে জয়ধ্বনি দিতে দিতে। আশপাশের বাড়ি থেকে মেয়েরা বাজাচ্ছে মঙ্গলশঙ্খ, পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে পথে। ও আমার কানে কানে বললো, "স্বামী বিবেকানন্দ। শিকাগো বক্তৃতায় বিশ্বজনতাকে উদ্ভাসিত করে ফিরলেন। "
-- "ধুস, তাই কখনো হয় নাকি? সে তো অনেকদিন আগে----"
-- "সব হয়, তাই তো রঙিন কাঁচের শার্সিতে দেখি।"
হবে হয়তো। ও দেখতে জানে। সূর্যের আলো আমাদের সবার কাছেই সাদা রঙের হয়ে তো আসে। কেবল প্রিজমের মধ্যে দিয়ে তার ভাঙন ঘটলে তবেই হাজার রঙের ছোঁয়া। মানুষের প্রকৃতিও কী তেমন নয়? ভালো মানুষ, আত্মভোলা মানুষ সব তখন বোঝা যায় যখন একটি বাধার সামনে ঠিকরে ভেঙে পড়ে আমার ভিতরের সবকটি আমি। তখন বোঝা চলে আমি নিজে একজন প্রতিক্রিয়াশীল কিনা! অথবা সেই প্রতিক্রিয়াশীলতা কখন সাতরঙে ফুটে ওঠে? যখন আমার ভিতরের নিরেট দেয়ালে লাগে আমার প্রকৃতির ঠোক্কর? তার আগে 'আমি' কে? প্রতিদিনের কাজে তিলতিল করে নিজের যে মূর্তি গড়ে ওঠে, তারমধ্যে কতোআনা ফাঁকি? নাহলে এই দুটো 'আমি'কে কিছুতেই খাপে খাপে মেলাতে পারি না কেন?
এক সন্ধ্যেবেলা ও এলো ছুটতে ছুটতে।
-- "কী কান্ড হয়েছে শিগ্গীর দেখবি চল।"
দুজনে চোখ রাখি নীলরঙা শার্সিটায়। এ কোন্ রঙ্গালয়? মিনার্ভা নাকি ষ্টার থিয়েটার? লোকজনের হাঁকডাক, কাজকর্ম। আসবাব আর সাজপত্র সরানোর শব্দ। কে এক তরুণী বারবার ধমক খাচ্ছে এক গম্ভীর মেজাজের অভিজাত চেহারার মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির কাছে। একখানা চিঠি নিয়ে ঢুকতে তার বারবার ভুল হচ্ছে। বারবার নির্দেশ দিয়ে সেই ব্যক্তি মাথা নাড়ছেন, "হবে না, তোর দ্বারা বিলকুল হবে না।" তরুণীর চোয়াল সংকল্পবদ্ধ।
আমার কানের কাছে ও ফিসফিস করে, "গিরীশচন্দ্র ঘোষ। তিনকড়ি দাসীকে লেডি ম্যাকবেথ শেখাচ্ছেন। বারবার শুরুটা ভুল করছে, কিন্তু তুলে নেবে দেখবি।"
-- "ধুস, তাই কোনোদিন হয়? "
না হলে আর রঙিন শার্সির কাছে আসা কেন? ওই তো, মঞ্চের রানীর ধড়াচূড়ো খুলে ফেলে গোলাপবালা দাঁড়িয়েছে গ্রিনরুমের আয়নার সামনে। চোখের কাজল গলে পড়ছে অশ্রুর সঙ্গে। ডানচোখে কটাক্ষ, বামদিকের গাল বেয়ে কালো একটি রেখা। জীবননদীর ক্লেদ।
--"বিনোদিনীকে দেখাতে পারিস?" চুপিচুপি জিজ্ঞেস করি আমি। ও মাথা নাড়ে। আমরা বেড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে যাই লাল শার্সিটার কাছে। রক্তিম বিকেল, মিছিলের ভিড়। ভিড়ের মিছিল। কলেজষ্ট্রীট জুড়ে চলেছে ছেলেটা। সব মিছিলের মাথা ছাড়িয়ে নির্বিশেষ থেকে বিশেষ হয়ে উঠেছে কেন? ঘরে ওর রুগ্ন বোন, আঁধার মা,বাবার পেনশনে যা একটু.... যারা হাঁটছে কারো চোখে লোকাল কমিটির স্বপ্ন, কারো একটা গদিআঁটা চেয়ারের, কেউ কেবল ভিড় বাড়াতেই হাঁটে। ওর টলটলে চোখে ভিয়েতনাম, বান্ দি - থিন, কিউবা, ব্রেখট, তুর্গেনেভ, গ্যেভারা, সিয়েরা মায়েস্ত্রা, শ্রীকাকুলাম।....
-- "আমি দেখবো না রে....আমি আর দেখবো না।"
কাঁচের শার্সির মোহ থেকে পালিয়ে আমি ছুট লাগাই। আর ওর ফ্রকের কোঁচড় ভরে শিউলি ছড়িয়ে পড়ে সিঁড়িল ধাপে, উঠোনে, শিউলিতলায়।
পুজোর আলোর রোশনাইতে ভেসে আনন্দের দিনে মনে পড়বে না। যখন শীতের রাতে অন্ধকার হয়ে উঠবে আরো জমাট? কর্পোরেশনের একঠেঙে আলো হলুদ-চোখো দত্যির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে? নতুন গুড়ের গন্ধে, ভাপা পিঠের কবোষ্ণ তাপ নিয়ে আবার বেড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে উঠে আসবো জানালায়। হাঁটু ছড়ে গিয়ে ঈষৎ জ্বালা। অপটু হাতে কাঁচ ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলি বর্তমানের সাঁকোয় চড়ে অতীতনদীতে ভবিষ্যত পারানির আশায়। শীত গম্ভীর হলে চুপিচুপি বলি,
--- "আবার রঙিন কাঁচের শার্সি দেখাবি?"
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।