এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ইয়োকাস্তার ঘরে- অরিত্র আহমেদ 

    Aritra Ahamed লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • *
    হয়তো এখন, এই মুহূর্তে,
    ঈদিপাস কেঁদে আকুল স্বর্গে,
    হাতে একখানা খাম

    সোনার কাটায় চোখের রক্ত
    সেই রক্তেই প্রেমের পত্র
    লিখেছেন তিনি-

    খামের উপরে ইয়োকাস্তার নাম!

    *
    ইয়োকাস্তার কপালটা একটু বেশিই খারাপ:
    তার জীবনের অনুপম, ইউরেকা মুহূর্তগুলি
    তাকে ভয়, যন্ত্রণা আর লজ্জা ছাড়া কিচ্ছু দেয়নি।
    সোনা খাঁটি কিনা জানতে গিয়ে বারবার সে দেখেছে
    সমূহ ভেজাল তার নিজেরই লড়াইয়ে, জ্ঞানে, দূষিত স্বজ্ঞায়।

    *
    (আরো ঈদিপাস)

    আমার মা ছিলেন জলকন্যা!
    আমার একান্ত সমুদ্রে বিদ্যুৎফলকের মতো
    হাজারো শুক্লপক্ষ তিনি সাঁতরে বেড়িয়েছেন শ্যাওলায়, প্রবালে;
    কখনো ভেসে বা কখনো ডুবে। যেমন কোনো কোনো সুর
    রং বিস্তার করে দিগন্তে, বসন্ত-জলধারে, তেমনি আমার মা
    আমার দিগন্ত ভরে তুলেছিলেন সোনাখঁচা তুষারে, পাগল ঝড়ে।
    কেননা তিনি ছিলেন জলকন্যা!

    আর হঠাৎ একদিন
    আমার মা হ’য়ে উঠলেন আমার প্রিয়তমা!
    আমি তাকে ভালোবাসলাম, তিনি আমাকে।
    আমি তাকে চুম্বন করলাম, আমাকে তিনি।
    তিনি আমার বুকে চুল ছড়িয়ে দিতেই আমি উগরে দিলাম উত্তাপ!
    আর এইভাবে এক আশ্চর্য অজাচারে ভরে উঠলো আমার সমুদ্র।
    আমার সমস্ত আলস্য পণ্ড হলো ঢেউয়ের অভিশাপে,
    কেননা আমার মা ছিলেন জলকন্যা, এবং এখন তো প্রিয়তমা!

    আমি কি বন্ধ্যাত্বের ভয় করিনি?
    আমি কি শঙ্কিত হইনি তারুণ্যের উজ্জ্বল অত্যাচারে?
    আমার মা কি চিনতে পারেননি আজন্মলুণ্ঠিত সমুদ্রপ্রাপ্ত পুত্রকে?

    না।
    আমি স্ফিংক্সের ধাঁধার উত্তর জানি না, আমি অজ্ঞ।
    আমার জ্ঞান অবশেষে অভিশাপ হ’য়ে ওঠার আগেই
    তাকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে আমি এখন ঈশ্বরহীন, সর্বেসর্বা;
    কিন্তু আমি রক্ষা পেলাম, আমার সমুদ্র চিরে আগুন উঠলো না।
    আমার নিভৃত পুরাণ হলো না ধাঁধার সঙ্গে ধাঁধার লড়াই, পাপের সঙ্গে পাপের।

    পৃথিবী জানলো না আমাদের অজাচারের আবিলতা;
    পৃথিবী জানলো আমি সৌন্দর্যের কারিগর, আমার মা আমারই সৃষ্টি,
    আমি ফুল, তিনি মৌমাছি; তিনি রং, আমি প্রজাপতি।
    আমার মায়ের ছিলো না দুঃখ, অনুশোচনা, বিক্ষোভ, বিরক্তি,
    আর আমাকেও সোনার কাঁটায় চোখ খোয়াতে হয়নি, যেতে হয়নি বানপ্রস্থে।
    কেননা তিনি প্রেয়সী হয়েই বেঁচে রইলেন আমার গোপন সমুদ্রে,
    কেননা মা ছিলেন জলকন্যা, আর জলকন্যারা আত্মহত্যা করতে জানে না!

    *
    (Wolfgang Amadeus Mozart- Violin Concerto No.5)

    °
    যেদিন আমি হারিয়ে ফেললাম আমার শেষ বেহালা,
    অথচ জানলাম আদতে প্রথম বেহালা বলেই কিছু ছিলো না;
    যেদিন আমার জীবন থেকে উবে গেলো জ্যামিতির উদ্ভাস,
    আর আমি ঢুকে পড়লাম মাটির নিচে উলঙ্গ মানুষের যুদ্ধে
    প্রায় কোনো অস্ত্র ছাড়াই;
    মনে হলো, বেহালাই আমাকে জেতাবে!

    যেদিন সমস্ত বেহালা থামলো,
    যেদিন আমার হেঁয়ালিতে ভরা হৃদয়
    অকালে ভুলে গেলো স্বপ্নে শোনা শয়তানের সুর;

    যেদিন আমার খাঁচার চাবি আমি নিজের হাতে ভেঙে ফেললাম
    আর আমার খাঁচার শিকে ধ্বনিত হলো বসন্তের শেষতম বেহালা;
    যেদিন আমি মরে গেলাম আর জানলাম আমি কোনো নিদর্শন হবো না;
    আমার উদ্ভট ছাইয়ে কেউ খুঁজবে না মুক্তো, কেউ ঘাটবে না আমার ফসিল;
    কেউ জানবে না কোন রাক্ষসীর পেটে গেলো আমার আশ্চর্য ক্ষতচিহ্নগুলো;

    যেদিন আমি স্বপ্ন, অথবা কে জানে, হয়তো স্বপ্নও নই;
    যেদিন আমার করতলে আর উদাস রক্তের দাগ থাকবে না;
    যেদিন আমি অমর, অথচ মৃত্যু ছাড়া আর কোনো প্রেমিকা আমার নেই;

    °
    সেদিন আমার বেহালা শুশুকের মতো লাফিয়ে উঠবে কোন সরোবরে, জানি না;
    সেদিন আমার বেহালা শজারুর মতো কাঁটায় কাঁটায় লুকোবে লুকোবে লুকোবে;
    রৌদ্রে তার অবিশ্বাস, পদকে তার লাঞ্ছনা, জীবনে তার অরুচি, মানুষে তার ভয়;

    সেদিন আমার বেহালা সব দ্বিধা ঝেড়ে মুগ্ধ হবে নিজের সুরেই;
    সেদিন আমি বিগত, অথচ আমার বেহালা স্বয়ম্ভু, কেননা সে জন্ম নেয়নি;
    সেদিন আমার সব ভয় হবে জল, আমি আদরে কুড়োবো ভূতের দেশের ফুল;
    সেদিন আমার বেহালা কাঁদবে আমাকে সাপের মতোন আদরের পাঁকে জড়িয়ে;
    সেদিন আমার সব ফুলে আমি আমার চিহ্ন খুঁজে পেয়ে পেয়ে কাঁদবো!

    একাকার হবে সূর্যের সাথে সূর্যগ্রহণ;
    যে শোভা থেকেও ছিলো না, বড্ড বেশি করে তাকে পাবো আর পাবো;

    সেদিন আমার চুমোয় ভরবে প্রতিটা গল্প, প্রতিটা ভুল, প্রতিটা বাতুলতা;
    সেদিন আমার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বেহালা ক্ষমা করে দেবে আমাকে;
    সেদিন আমার মুখোশের ফুল একে একে খসে পড়বে, আমিও ক্ষমা করবো না নিজেকে;
    সেদিন আমার দুঃস্বপ্নেও আসে না, অথচ সেইদিনই আমি নিজেই বেহালা হবো!

    °
    যেদিন আমি হারিয়ে ফেললাম আমার প্রথম ও শেষ বেহালা,
    যেদিন সমস্ত সুর হারিয়ে ফেললো জেলিফিশের জাদুর আলো,
    যেদিন সমস্ত বেহালা, সমস্ত সুর আমাকে ঠেলে দিলো অনাদি মর্ষকামে;

    সেদিন মরেও না মরে, শান্তি পেয়েও শান্ত না হয়ে,
    আমি তিলে তিলে হ’য়ে উঠতে থাকবো এক সমুদ্র, একটা অর্বাচীন বেহালা;
    আমার স্মৃতির হাতে দুলবে বেহালা, আমার ফসিলের প্রাণে প্রাণে আসবে সুর-

    আপাতত এই যন্ত্রণামুখর পৃথিবীতে কেউ আমাকে একলা ছেড়ে যেও না!

    *
    উপায় থাকলে সকল পুরুষই
    ইয়োকাস্তার সোনার কাটায়
    দু’চোখ খোয়াতো রাজ্য তুচ্ছ করে:
    কেননা পুরুষ যে পথেই যায়
    ঘুরেফিরে সেই পথ গিয়ে থামে
    প্রেমের শীর্ষে, ইয়োকাস্তার ঘরে

    *
    তিনটে অসম্ভবের আমি অসম্ভব ভক্ত:
    ইকারুসের পাখা,
    ইয়োকাস্তার প্রেম,
    ওডেসীয়ুসের নস্টালজিয়া;
    সূর্যের ধারে পৌঁছিয়ে ধাঁধামুক্ত ইকারুস
    ইয়োকাস্তার সত্যের কথা ভাবে,
    ওদিকে ক্যালিপসোয় মিশে একাকার ওডেসীয়ুস দূর সমুদ্রে
    সকাতরভাবে মিস করে ফেলে আসা ইয়োকাস্তা-কে:
    আর ইয়োকাস্তা জানে, তার না আছে পাখা,
    না আছে নস্টালজিয়া;
    প্রেম আর ধাঁধা থেকে বাঁচবার জন্য মৃত্যুই তার একমাত্র সজ্জন।

    *
    এমনকি পেনিলোপির মুখের দিকে তাকালে,
    সোনার কাটার হাতে নিলে,
    ওডেসীয়ুসেরও মনে হতো,
    ওই মুখে, ওই সোনার কাটায়, কোথাও না কোথাও,
    লেগে আছে ইয়োকাস্তার চিহ্ন:
    মা।


     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন।