আজকাল বাজারে সততার দাম ঠিক কত, সেটা জানার জন্য আপনাকে কোনো অর্থশাস্ত্রীর কাছে যেতে হবে না; পাড়ার মোড়ে নীল-সাদা রঙের একটা জীর্ণ ল্যাম্পপোস্ট দেখলেই বুঝবেন—এখানে উন্নয়ন এখন ফেরিওয়ালার হাঁকডাকের মতো। আমাদের প্রিয় রাজনৈতিক দলটির বিবর্তন অনেকটা সেই বিরিয়ানির আলুর মতো—আগে যা ছিল পার্শ্বচরিত্র, এখন তা-ই হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল আকর্ষণ। বাকি চাল-মাংসের (পড়ুন: সাধারণ জনতা) অস্তিত্ব এখন কেবল সেই আলুকে মহিমান্বিত করার জন্য।
বাংলার আকাশ-বাতাস এখন এক অদ্ভুত 'ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে' বন্দি। আগে লোকে দলবদল করত আদর্শের টানে, এখন করে আর্দ্রতার টানে। বর্ষা নামলেই যেমন ব্যাঙেরা ডাক পাড়ে, তেমনি নির্বাচনের হাওয়া দিলেই এ-ফুল ও-ফুলে ঝাঁপ দেওয়াটা এখন কোনো নৈতিক স্খলন নয়, বরং একটি 'ফিটনেস রেজিম' মাত্র। শরীরের ফ্যাট ঝরানোর মতো করেই জননেতারা নিজেদের পুরনো আনুগত্য ঝরিয়ে ফেলছেন। এই যে অবলীলায় এক গেট দিয়ে ঢুকে অন্য গেট দিয়ে বেরিয়ে আসা—একে বেইমানি বলাটা বড়ই অর্বাচীনতা; এটা আসলে একপ্রকার রাজনৈতিক 'পার্কুর' (Parkour)।
"দুর্নীতি এখন আর কোনো অপরাধ নয়, ওটা এখন এক ধরণের জীবনশৈলী বা লাইফস্টাইল। খামারে ঘাস বাড়লে গরু তো আসবেই, কিন্তু সমস্যা হলো ঘাস যখন নিজেই গরুকে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।"
প্রশাসনিক এই সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা দেখে মনে হয়, আমরা আসলে এক বিরাট জাদুঘরের ভেতরে আছি। যেখানে উন্নয়নের পোস্টারগুলো রঙিন, আর সাধারণের জীবনটা সাদাকালো। দিদির সুরক্ষা-কবচ হোক বা দাদার জনসংযোগ—সবই যেন মঞ্চস্থ করা এক একটি মহাকাব্য। ক্যামেরার সামনে বৃদ্ধার পা ছুঁয়ে প্রণাম করা আর ক্যামেরার পেছনে সেই পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া—এই শিল্পকলা আয়ত্ত করতে অনেকগুলো 'তৃণমূল' স্তর পার হতে হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা কেউই এতে অবাক হই না। আমরা হাসিমুখে লাইনে দাঁড়াই—কখনো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য, কখনো বা দুর্নীতির লাইনে নাম লেখাতে। আসলে এই দলটির বড় সাফল্য এটাই যে, তারা আমাদের মধ্যে থাকা সেই আদিম লোভটাকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিয়েছে। এখন পকেটমার ধরা পড়লে পুলিশ তাকে মারধরের বদলে হয়তো জিজ্ঞেস করে, "ভাই, পার্সেন্টেজটা ঠিকমতো ভাগ করেছ তো?"
বাঙালির চায়ের আড্ডায় এখন আর রবীন্দ্রনাথ নেই, আছে ইডি-সিবিআইয়ের রুট ম্যাপ। আমরা হাসছি, কারণ কান্নাটা এখন বড় বেশি মহার্ঘ। দেওয়ালে ঘাসফুল আঁকা আছে, আর আমরা সেই ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি—একদিন নিশ্চয়ই এই ঘাস থেকেই ধান হবে। তবে সেই ধানে চাল হবে কি না, নাকি কেবলই চিঁড়ে ভেজানো নাটক—সেটা অবশ্য মহাকালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার বিষয়।
আপাতত, আসুন আর এক ভাঁড় চা খাই। চিনিটা একটু কম দেবেন, কারণ রাজ্যের রক্তে সুগার (পড়ুন: প্রশাসনিক অস্থিরতা) এমনিতেই বেশ চড়া।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।