এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফরাসিদের সম্পর্ক

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯৪ বার পঠিত
  • সিরাজ উদ দৌলা সতেরোশো ছাপান্নর বিশে জুন ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি কলকাতা দখল করে নাম বদলে দিলেন আলিনগর। তিনি জয়ের পর যে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছিলেন তাতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু নয় ফরাসি আর ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও আর্থিক গুনাগার দিতে হচ্ছে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এস সি হিলের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে সে বছর জুলাই মাসে সিরাজের দরবারে ফরাসিদের তিন লাখ টাকা নজরানা দিতে বাধ্য করা হয় আর ওলন্দাজদের দেওয়া টাকার পরিমান নাকি আরো বেশি ছিল। ইংরেজদের মতো ফরাসিদেরও কেল্লা সুরক্ষা বাড়াতে দিতে সিরাজের ঘোরতর আপত্তি ছিল। কিন্তু সাতান্নর জানুয়ারিতে করমণ্ডল উপকূল থেকে ক্লাইভ আর ওয়াটসনের নেতৃত্বে বিশাল নৌবহর এসে একের পর এক আগ্রাসী অভিযান চালায়। ব্রিটিশরা কলকাতা পুনর্দখল নিতে, চন্দননগরের ফরাসি কেল্লার পাশ দিয়ে নদী বেয়ে হুগলী আর ব্যান্ডেলের মোঘল কেল্লা আক্রমণ করতে, সর্বোপরি আবার কলকাতার দখল নিতে আসা সিরাজের সেনা শিবিরে ক্লাইভের আচমকা আক্রমণের তাগদ দেখে সিরাজ দমে যান ও ইংরেজদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সতেরশো সাতান্নর ফেব্রুয়ারিতে সম্পাদিত ওই চুক্তি (১৭৫৭-র ৭ই ফেব্রুয়ারিতে আলিনগরের চুক্তি) যার বলে ফারুখ শিয়রের মোঘল ফরমান মতো ইংরেজরা মুক্ত বাণিজ্যের অধিকার ফিরে পায় তাই নয়, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কেল্লার সুরক্ষা অবাধে বাড়ানোর অর্থাৎ সামরিক শক্তি বাড়ানোর, এমনকি টাঁকশালে নিজেদের টাকা ছাপানোর নবাবী হুকুমও পায়।

    এই সব ঘটনায় প্রমাদ গুনলেন সিরাজ। তিনি ফরাসি আর ওলন্দাজদের ইংরেজদের বিরুদ্ধে সঙ্গে পেতে চাইলেন। ওলন্দাজরা এসবে ঢুকতে চায় নি, তারা ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত ছিল। আর্মেনীয় সওদাগর প্রধান খোজা ওয়াজেদ ফরাসিদের সঙ্গে নবাবের মধ্যস্থতা করেছিলেন। কিন্তু ফরাসিদের সঙ্গেও সিরাজের চুক্তি হয়েছিল এরকম জানা যায় না। যতই ইউরোপের মাটিতে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধ ঘনিয়ে আসুক বিদেশ বিভূঁয়ে এসে ফরাসিরা কতটা নবাবকে বিশ্বাস করবে আর কতটা ইংরেজদের সঙ্গে মানিয়ে নেবে এ নিয়ে দোটানা থাকতে পারে। তবে হিল বলেছেন কিছু ফরাসি গোলন্দাজ কলকাতা আক্রমণের সময় নবাবের বাহিনীতে ছিল সেটা ইংরেজদের কাছে খবর হয়ে থাকবে। হিল আরো বলছেন নবাব জলপথে ইংরেজদের ঠেকাতে চন্দননগর ফরাসি ফ্যাক্টরির প্রধান মসিয়েঁ রেনোকে দুর্গ সুরক্ষিত করার অনুমতি দিয়েছিলেন আর সে জন্য পরে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া টাকার কিছু অংশ যার অর্থমূল্য লাখ খানেক টাকা, ফেরত দেন। মজার ব্যাপার হলো ফরাসি সেনাদের নবাবের সঙ্গে কাজ করাকে দলত্যাগী ইংরেজদের ফরাসিদের দলে যোগ দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে পরিস্কার হয় যে এরকম দল বদলের ঘটনা আকছার ঘটত। ইউরোপীয়রা সৈন্যরা বিদেশে এসে প্রতিকূল জলবায়ু, বিপজ্জনক রাস্তাঘাট, অনিয়মিত মাইনের অনিশ্চয়তার পরিবেশে ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ নীতিতে এরকম হরবখত দল বদলে সুযোগসন্ধানী ভাড়াটে সৈন্যের ভূমিকা পালন করে আসছিল বহুযুগ ধরে। ভারতের ভাড়াটে সৈন্যের বিশাল বাজারে এরা নিজেদের নিলামে চড়াত। এভাবেই জাহাঙ্গীরের আমল থেকে বাংলার মোঘল ফৌজে পর্তুগিজদের দেখা গেছে বিরাট সংখ্যায়। মসিয়েঁ রেনোকে লেখা ক্লাইভের চিঠিতে জানা যাচ্ছে ফরাসি ফৌজে প্রাক্তন ইংরেজ যোদ্ধাদের নেওয়ায় আপত্তির কথা। যথারীতি রেনো ওই চিঠিকে পাত্তা না দিয়ে বেশি মাইনেতে দলত্যাগী ভাড়াটে ইংরেজ সৈন্য নিয়োগ করতে থাকেন।

    আলিনগরের চুক্তির পরপরই খোজা ওয়াজেদকে দিয়ে ফরাসিদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের দরবার যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকলেও, ওই চুক্তিকে ফরাসিরা ইংরেজদের প্রতি নবাবী পক্ষপাত বলে মনে করত। হিল সাহেব মসিয়েঁ রেনোকে উদ্ধৃত করে বলছেন, " …… সদ্য সম্পাদিত চুক্তি( ইংরেজদের সঙ্গে) দেখে আমরা পরিস্কার বুঝছি ওই চুক্তির বলি হতে চলেছি আমরা, আর সিরাজ উদ দৌলার যা স্বভাব, তাতে ব্রিটিশরা আক্রমণ করলে প্রতিশ্রুতি মতো তিনি কতটা জোরদার সাহায্য করবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি কই। যা হবে তার জন্য প্রস্তুতি জোরদার করতে আমি কেল্লায় সব জোগাড়যন্ত্র করে রাখছি। '' (….we saw clearly from the treaty just made (with the English) that we should be its victims, and knowing Siraj-uddaula's character, his promise to assist me strongly if theEnglish attacked us did not quiet my mind. I prepared for whatever might happen by pressing on our preparations and collecting all kinds of provisions in the Fort. )

    ইঙ্গ–ফরাসি যুদ্ধ উপক্রম হলেও দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি চুক্তি নিয়ে কিছুদিন কথাবার্তা চলে। আসলে ইংরেজরা নবাবের সঙ্গে ফরাসিদের কোনো না কোনো ভাবে হাত মেলানোর বিষয়ে আশংকিত ছিল। অবশেষে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের কাছে নির্দেশ আসে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার। এই সময় আহমদ শাহ আব্দালির দিল্লী আক্রমণের ঘটনায় আশংকিত নবাব ব্রিটিশ সাহায্য প্রার্থী হচ্ছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সূত্র। হিল বলছেন ক্লাইভ তেসরা মার্চ মুর্শিদাবাদের দিকে ফৌজ নিয়ে কুচ শুরু করলেন আর অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সিরাজকে চিঠি লিখছেন যে শত্রুভাবাপন্ন ফরাসিদের পেছনে রেখে চন্দননগর টপকে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার অসুবিধার কথা।
    এর উত্তরে সিরাজের এক চিঠির কথা বলছেন হিল সেখানে নাকি বলা হয়ঃ
    আপনি প্রাজ্ঞ ও উদার : যদি আপনার শত্রু খোলামনে আপনার সুরক্ষা প্রার্থী হয়, আপনি তার জান নেবেন না, কিন্তু তখন আপনাকে তার মতলবে সন্তুষ্ট হতে হবে, যদি আপনি তা না হন, আপনার যা ভালো মনে হয় করুন।
    You have understanding and generosity : if your enemy with an upright heart claims your protection, you will give him life, but then you must be well satisfied of the innocenceof his intentions : if not, whatever you think right, that do.

    অর্থাৎ এক রকম চন্দননগর আক্রমণের ছাড়পত্র দিলেন সিরাজ।

    ফরাসি সূত্র অবশ্য সিরাজের এই চিঠিকে জাল বলে এটাকে ইংরেজদের চন্দন নগর আক্রমণের বাহানা বলছে। এ কথা ফরাসি কম্যান্ডার মসিয়েঁ ল A Memoir of the Mughal Empire: Events of 1757-1761 বইতে লিখেছেন। সে যাই হোক হয়ত ‘তুই জল ঘোলা না করলে, তোর বাপ করেছে অজুহাতে’ বারোই মার্চ ক্লাইভ চন্দননগর পৌঁছে রেনোকে আত্মসমর্পণের চিঠি দিচ্ছেনঃ

    মহাশয়,
    গ্রেট ব্রিটেনের রাজা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাই আমি তাঁর নামে আপনাকে চন্দননগরের দুর্গ সমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। অস্বীকার করলে পরিণতির দায় আপনার এবং এ ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আপনার সঙ্গে আচরণ করা হবে বলে ধরে নেবেন।
    মহাশয়, আমি আপনার অত্যন্ত অনুগত ও বিনীত সেবক হওয়ায় সম্মানিত,
    রবার্ট ক্লাইভ।

    Sir,
    The King of Great Britain having declared war against France, I summons you in his name to surrender the Fort of Chandernagore. In case of refusal you are to answer the consequences, and expect to be treated according to the usage of war in such cases.
    I have the honour to be, sir,
    Your most obedient and humble servant,
    Robert Clive.


    এর উত্তর না পেয়ে চোদ্দ তারিখ রাত তিনটের সময় ক্লাইভ চন্দন নগরের ফরাসি কেল্লার দক্ষিণ–পশ্চিমে একটা মাটির ব্যাঙ্কারে ছোটখাটো আক্রমণ শুরু করেন। হয়ত তিনি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের যুদ্ধ জাহাজগুলোর প্রতীক্ষায় রণকৌশল সাজাচ্ছিলেন। ভারী বড় জাহাজগুলো হুগলী নদী বেয়ে আসার জন্য নির্ভরশীল ছিল জোয়ারের ওপর, তাই সময় লাগছিল। স্থলপথ আর জলপথের আক্রমণের সমন্বয়ে ফরাসিদের হারানোটাই ছিল ইংরেজ কৌশল। এদের আটকানোর জন্য ফরাসিরা নদী গর্ভে নিজেদের বেশ কিছু জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে নাব্যতা কমানোর মরিয়া চেষ্টা করে। ফরাসিরা মহিলা, শিশুদের শ্রীরামপুর, চুঁচড়োতে সরিয়ে তৈরি ছিল। তাদের সঙ্গে দু হাজার দেশি ফৌজও ছিল। কম্যান্ডার মসিয়েঁ ল বলছেন ইংরেজরা কলকাতা ছাড়ার পরপরই তিনি নবাবকে বিশেষ অনু রোধ করে এদের আনিয়েছিলেন। ষোল তারিখ হুগলীর মোঘল ফৌজদার নন্দকুমারকে এক চিঠিতে ক্লাইভ ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করার জন্য ধূর্ত ফরাসিদের দায়ী করলেন যারা মোঘল দরবারের দস্তক - অবাধ বাণিজ্যের আদেশপ্রাপ্ত ব্রিটিশ নৌকো আটক করে নবাবকে বেইজ্জত করছে। নন্দকুমারকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে কিছু নবাবী ফৌজ প্রচুর টাকার লোভে ফরাসিদের হয়ে লড়তে গেছে তাদের যেন নিরস্ত করা হয়। এর থেকে চন্দননগর আক্রমণের সময় মসিয়েঁ ল র দাবী অনুযায়ী সেখানে নবাবী ফৌজের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়। এর থেকে আরো বোঝা যাচ্ছে যে ফরাসি আর নবাবের জোট ইংরেজদের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। আবার নবাবেরও যে বার কয়েক রগড়ানি খাওয়ার পর ইংরেজদের সম্পর্কে ভীতি জন্মে ছিল তার একটা প্রমাণ হচ্ছে যে রায় দুর্লভের নেতৃত্বে নবাবী ফৌজ মুর্শিদাবাদ থেকে কুচ শুরু করেও পনেরো মাইল দূরে এগিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইংরেজ সূত্র বলছে ক্লাইভের ভয়ে রায় দুর্লভ চন্দন নগরের দিকে এগোন নি। এ কথা আমূলক নয় তা বোঝা যায় বাইশে মার্চ রায় দুর্লভকে লেখা ক্লাইভের চিঠি থেকে। সে চিঠিতে সুস্পষ্ট হুমকির সুরঃ
    শুনলাম আপনি হুগলির ২০ মাইলের মধ্যে পৌঁছে গেছেন। আপনি বন্ধু হয়ে আসছেন, না শত্রু হয়ে — আমি জানি না। যদি শত্রু হয়ে আসেন, এখনই বলুন, আমি কিছু লোক পাঠিয়ে আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করাব। ... এখন আপনি আমার মনোভাব জানলেন।
    "I hear you are arrived within 20 miles of Hughly. Whether you come as a friend or an enemy, I know not. If as the latter, say so at once, and I will send some people out to fight you immediately . . . Now you know my mind."

    মসিয়েঁ ল সাহায্যের জন্য কাকুতিমিনতি করলেও মুর্শিদাবাদ দরবারে বসে ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস চন্দননগর রক্ষায় সেনা অভিযানের বিরুদ্ধে কলকাঠি নেড়ে নবাবকে নিরস্ত করলেন। দিন দশেক অবরোধ ও প্রতিরোধের যুদ্ধে দুপক্ষের বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ফরাসি গোলার মুখে ইংরেজদের বড় বড় যুদ্ধ জাহাজ কেন্ট আর টাইগার ভারী কামান নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছিল। সত্যি বলতে দুই জাহাজের অনেক নাবিক আর অফিসার হতাহত হয় ফরাসি গোলায়। ঊনিশে মার্চ ওয়াটসন চন্দননগরে পৌঁছে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে ফরাসিদের আত্মসমর্পণের ফতোয়া জারি করলেন। বৃটিশ বড় জাহাজের ভারী কামানের গোলায় উড়ে যাবার ভয়ে ফরাসিরা কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে ঝামেলা মেটাতে চায় কিন্তু সে প্রস্তাব ওয়াটসন গ্রাহ্য করেন নি। এরপর দিন তিনেক প্রতিরোধের পর ব্রিটিশরা ফরাসি কেল্লা পুরো ঘিরে ফেলে। ভরা জোয়ারের সুযোগে ব্রিটিশ জাহাজগুলো এগিয়ে আসে আর তেইশে সকালের দিকে মসিয়েঁ রেনো সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করলেন। সেদিনই বিকেল তিনটের মধ্যে উভয়পক্ষের সম্মতিতে ব্রিটিশরা কেল্লার দখল নিচ্ছে। এরপরই শুরু হয় ব্রিটিশদের পাঁয়তারা, যেহেতু শান্তিচুক্তি সম্পাদনের আগেই কেল্লা দখলে এসেছে তাই কোনো কিছু না মেনেই ইংরেজরা ফরাসি সৈন্যদের দেড়শোর মতো একটা দলকে ধাওয়া করে গুলি করে মারে অনেককে। বেঁচে যাওয়া সৈন্যরা, সংখ্যায় তারা আশি জনের মতো, পালিয়ে, পথ হারিয়ে ছন্নছাড়া অবস্থায় কিছু লোক মসিয়েঁ লর কাছে কাশিমবাজার ফরাসি ফ্যাক্টরিতে পৌঁছতে পেরেছিল। দেশীয় প্রজা বা জমিদারদের কাছে কেবা ইংরেজ, কেবা ফরাসি আর মোঘল প্রশাসনের এক দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থা সব মিলিয়ে পলাতক ফরাসি সৈন্যদের খুব কিছু স্থানীয় বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।
    যুদ্ধের পর যথারীতি অবাধ লুটপাটের অনেক ঘটনার কথা বলছেন হিল। শান্তি চুক্তির কিছু বিষয় বেশ আকর্ষণীয় যেমন প্রথম দফাতেই দলত্যাগীদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে (The lives of the deserters to be spared. Answer, The deserters to surrender absolutely)। তৃতীয় দফায় ফরাসি গ্যারিসনের সেনাদের যুদ্ধবন্দী মর্যাদা দেবার কথা বলেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যে বিদেশী সেনারা ব্রিটিশ ফৌজে সামিল হবে (Soldiers of the garrison to be prisoners of war. Answer. Agreed to, on condition that foreigners may enter the English service)। চতুর্থ দফায় সেপাইদের মুক্তি দেবার কথা বলা হচ্ছে (Sepoys of the garrison to be set free. Answer. Agreed to.)। মানে ফরাসিদের মধ্যে থাকা প্রাক্তন ব্রিটিশ সেনাদের যে কোনো ভাবে হেফাজতে নিতে চাইছে জয়ী ব্রিটিশ পক্ষ। বিপরীতে মোঘল প্রশাসনকে বেশি না ঘাঁটিয়ে ফরাসিদের মধ্যে থাকা দেশী বা নবাবী সৈন্যদের নিঃশর্তে ছেড়ে দিচ্ছে তারা।

    এবার চন্দননগর ছেড়ে কাশিম বাজারে আসা যাক। মুর্শিদাবাদের হাতায় সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র কাশিমবাজারের ইংরেজ আর ফরাসি ফ্যাক্টরি গুলো সিরাজের কলকাতা অভিযানের প্রথম শিকার হয়। সেখানের ফরাসি ফ্যাক্টরির প্রধান মসিয়েঁ লর সঙ্গে সিরাজের বিশেষ খাতিরদারি ছিল। কলকাতা অভিযানের আগে নবাব লকে চিঠিতে কলকাতা অভিযানে চন্দন নগরের ফরাসি জাহাজ আর ফৌজের সাহায্য চেয়েছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সেখানে নবাব দুই ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে সংঘাতের কথা বলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সাহায্য চেয়ে কূটনৈতিক প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এমন কি ফরাসি প্রতিনিধিকে প্রকাশ্য দরবারে সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে কলকাতা দখল করে তা ফরাসিদের হাতে তুলে দেবার প্রস্তাবও দিচ্ছেন সিরাজ। সেসব মেনে নেওয়া যে কোন ভাবেই সম্ভব নয় এ কথা মসিয়েঁ ল সিরাজকে বুঝিয়ে ছিলেন কারণ তখন ফরাসি আর ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থের সংঘাতকে বোঝাপড়ার মাধ্যমে মিটিয়ে নেবার অবস্থায় ছিল। এতে সিরাজ তাঁর হাত দিয়ে পন্ডিচেরির ফরাসি গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্যের আবেদনও করেছিলেন বলে জানাচ্ছেন মসিয়েঁ ল। এসব কোনোটাই বাস্তবায়িত না হওয়ায় ইতিহাসের বিস্মৃতির গর্ভে চলে গেছে। চন্দননগর দখলের পর ইংরেজরা মুর্শিদাবাদ দরবারে তাদের প্রতিনিধি ওয়াটসের মাধ্যমে নবাবের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এ ব্যাপারে তাদের প্রধান সহায় ছিল জগৎ শেঠ আর অন্য দেওয়ানরা। সেই চাপে সিরাজ কাশিমবাজারের ফরাসি ফ্যাক্টরির সুরক্ষায় গড়ে তোলা একটা মাটির ব্যাংকার ভেঙে দেওয়ার জন্য লোক পাঠালেন ইংরেজদের এক দেশী প্রতিনিধি কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা দেখতেও গেল। এটা ঘটছে সে সময়ে যখন মসিয়েঁ ল ওয়াটসের চিঠি আটক করছেন তাতে লেখা ছিল ব্রিটিশ সেনার পরবর্তী গন্তব্য সোজা মুর্শিদাবাদ। আসলে সিরাজের ওপর কাশিমবাজার ফ্যাক্টরি ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রবল চাপ ছিল, সেটা ঠেকানোর জন্য নবাব কিছু ম্যানুভারিং করে থাকবেন।

    লকে দরবারে ডাক করিয়ে সিরাজের অনুপস্থিতিতে ওয়াটসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ায় হয়েছিল। সেখানে ওয়াটস তাঁকে হয় ফ্যাক্টরি ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে নয় কলকাতা চালান হতে বলেন। যথারীতি ল রাজি হন নি কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন যে মুর্শিদাবাদ দরবারের কাছে তিনি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন তাই তাঁকে কাশিমবাজার ছাড়তেই হবে। এরপর সিরাজের উপস্থিতিতে এক দরবারে শেষ ফয়সালা হয়ে গেল.বলেছেন ল। নবাব নিজেই ইংরেজদের মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে আসার জন্য ফরাসিদের দায়ী করলেন। তিনি ফরাসিরা যে নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে পারবেন না এ বলে লকে সুবা ছাড়ার আদেশ দিলেন। ষোলোই এপ্রিল ফ্ল্যাগ তুলে ড্রাম বাজাতে বাজাতে জনা একশো ইউরোপীয়, ষাটজন তেলেঙ্গা আর তিরিশটা বলদে টানা গাড়ি, চারটে হাতি নিয়ে মসিয়েঁ ল বীরদর্পে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পাটনার দিকে গেলেন। দিল্লীর মোঘল সেপাইসালার আব্দুল্লা খানের কাছে পাঠানো নবাবের একটা চিঠি ক্লাইভের হাতে পড়ে, তার থেকে ইংরেজরা জানতে পারছে নবাব চুপিচুপি হাজার দশেক টাকা মসিয়েঁ লকে দিয়েছিলেন পথ খরচের জন্য। তবে যাবার আগে ল নবাবের সাহায্যে মসিয়েঁ সিনফ্রের নেতৃত্বে চল্লিশ জন গোলন্দাজের একটা দল রেখে যান। .পলাশীর যুদ্ধে যারা ক্লাইভকে প্রায় হারিয়েই দিচ্ছিল আরকি। সে যুদ্ধে হেরে সিনফ্রে পালান বীরভূমে। সেখানকার কোনো এক জমিদার ইংরেজদের কাছে ভালো সাজতে তাঁকে তাদের হেফাজতে তুলে দিলে কী যে হয় কোনো খবর নেই।

    লকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাদের হাতে তুলে না দেওয়ার অভিযোগে ক্লাইভ নবাব সিরাজ উদ দৌলাকে চিঠি লেখেন। যার উত্তরে সিরাজের এক বিখ্যাত চিঠির কথা আলোচনা করেছেন অধ্যাপক রজতকান্ত রায়। উত্তরে নবাব বলছেন:

    মিস্টার ল’ সম্বন্ধে আপনি যা লিখেছেন — যে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়া অত্যন্ত অনুচিত ছিল, এবং তারা আমার শত্রুদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমার বিরুদ্ধে যাবে, তাই আপনার বাহিনী তাদের অনুসরণ করবে, আর আপনি চেয়েছিলেন যে আমার পক্ষ থেকে তারা যেন কোনো বাধা না পায়—দুর্বলকে বা যারা তাদের সুরক্ষা ভিক্ষা করেছে, তাদের বন্দী করা বা তাদের শত্রুদের হাতে সমর্পণ করা হিন্দুস্তানের রীতি নয়।
    ‘As to what you have wrote regaring Mr. Law, that it was very improper to set him at liberty, and that they should join with my enemies against me, therefore your forces would follow them, and you desired that they might meet with no opposition from me, it is not the custom of Hindostan to bind or deliver up to their enemies the weak or those who have begged their protection.’

    এ চিঠির প্রসঙ্গে অধ্যাপক রায় আরেক অধ্যাপক বেইলির বলা আকবর অনুপ্রাণিত ‘নির্দিষ্ট অর্থে ভারতীয় সাম্রাজ্যিক স্বদেশীকতার’ অর্থাৎ মোঘল স্বদেশীকতা (patriotic Mughal cause) চালিত সিরাজের দৃঢ়পণ মনোভাবের কথা বিশেষ ভাবে আলোচনা করেছেন।

    মসিয়েঁ ল পলাশীর যুদ্ধের খবর পেয়ে নবাবকে সাহায্য করতে অনেকদূর এসে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্য ভরসা না করে মীর জাফর ও অন্যদের প্ররোচনায় তড়িঘড়ি যুদ্ধে গিয়ে হারতে হচ্ছে নবাবকে। ফরাসি গোলন্দাজদের বড় অংশটা মসিয়েঁ লর নেতৃত্বে নবাবের সঙ্গে তেইশে জুন পলাশীর ময়দানে থাকলে ক্লাইভের কপালে দুঃখ ছিল এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সেসময় সামরিক প্রযুক্তিতে ফরাসিরা ইংরেজদের থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিল সেটা চন্দননগরের যুদ্ধেই টের পেয়েছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। তাঁর নিজের জাহাজ কেন্টের ভালো রকম ক্ষতি হয়েছিল তুলনায় অতি অল্প ফরাসি গোলন্দাজদের বীরত্বে।

    সূত্রঃ
    ১) THREE FRENCHMENIN BENGAL OR THE COMMERCIAL RUIN OF THE FRENCH
    SETTLEMENTS IN 1757 BY, S. C. HILL
    ২) The Felt Community: Commonalty and Mentality Before the Emergence of Indian Nationalism, Rajat Kanta Ray

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন।