পনেরো মিনিটের মধ্যেই বাড়িটা ঘুরে দেখল কৃষ্ণজীবন। গাঁয়ের বাড়ি যেমন হয় তেমনি। কোনও আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই। এ বাড়িতে তাদের চার পুরুষের বাস ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস তো খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও। শুধু স্মৃতি, শুধু মায়া নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে তার বাবা। দেশ বলতেই ভিজে যায় মন।
রজব আলিকে আনোয়ার বোঝাচ্ছিল, ইনি একজন মস্ত মানুষ। চারদিকে নাম। দেশ-বিদেশের পণ্ডিতেরা চেনেন। মোটাসোটা কেতাব লেখেন।
রজব আলি এ সব শুনে যেন বিগলিত হয়ে যায়। নিজের ছেলেরা সবাই ক্ষেতখামারে কাজ করছে। তাদের ডেকে দেখাতে পারল না বলে দুঃখ করে বলল, আবার আসেন একবার। সারাদিন থাকবেন।
ফেরার সময় কৃষ্ণজীবন উঠোনের বাইরে একটা ঝুপসি আমগাছের নীচে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, এটা কি পুরনো গাছ?
জী। আপনার বাপ-দাদার আমলের। বুড়ো গাছ।
একটা ছোট পল্লব ভেঙে নেবো?
রজব আলি শশব্যস্তে বলল, নিশ্চয়ই। দাঁড়ান আমি পেড়ে দিই।
আমিই নিচ্ছি।
একটা পাতাসমেত ছোট ডাল গাছ থেকে ভেঙে নিল সে। এটার চেয়ে মহার্ঘ উপহার বাবার জন্য আর ভাবতে পারে না সে।
দু’ দিন বাদে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরল সে। তারও দু’ দিন বাদে বিষ্টুপুর।
বিষ্ণুপদ হাঁ করে অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে সব শুনল। তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে, গ্রামটা এখনও আছে, বাড়িটা আছে। বারবার তাকে স্পর্শ করল হাত বাড়িয়ে। বলল, সব দেখলি, অ্যাঁ! সব দেখলি?
হ্যাঁ বাবা, সব।
বল, আরও বল, সব শুনি।
বাবাকে কদাচিৎ এত উত্তেজিত দেখেছে কৃষ্ণজীবন। একটা মানুষের কত টান থাকে তার পূর্বপুরুষের ভিটের ওপর! অথচ সেখানে কীই বা ছিল আলাদা রকমের? কাঁচা বাড়ি, পুকুর, গাছপালা। কিন্তু ওভাবে তো দেখে না মানুষ। তার স্মৃতি, তার মায়া, তার পক্ষপাতই অন্য একটা মাত্রা যোগ করে দেয়। তখন আর সাধারণ একটা বাড়ি সাধারণ থাকে না। হয়ে যায় রূপকথার মতো অলৌকিক।
উঠোনের বাইরের দিকে একটা আমগাছ ছিল বাবা, মনে আছে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। মধুগুলগুলি আম। আছে সেটা?
আছে। তার একটা পল্লব এনেছি আপনার জন্য।
সাগ্রহে পল্লবটা হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকায় বিষ্ণুপদ। কয়েকদিনে পল্লবটা একটু শুকিয়ে গেছে। বিষ্ণুপদ তবু অবাক চোখে পল্লবটার দিকে চেয়ে থাকে। যেন অবিশ্বাস্য কিছু দেখছে।
কৃষ্ণজীবন সারাদিন ধরে বাবাকে ঘুরে ফিরে দেখল। বিষ্ণুপদ বড় নিঃঝুম হয়ে আছে আজ। কথা নেই। স্মৃতির তাড়নায় আজ বিষ্ণুপদ অনেক তফাত হয়েছে।
নয়নতারা একবার বলল, বড় ভয় লাগছে বাবা। ও যে মুখে একদম কুলুপ এঁটেছে।
কৃষ্ণজীবন বলল, আজ আর বাবাকে ঘাঁটিও না মা। আপনমনে থাকতে দাও। আজ বড় পিছুটান।
আম্রপল্লবটা সেই যে ধরে বসে আছে, একবারও ছাড়েনি।
বিষ্ণুপদ ভাতের গরাস নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, বুঝলে তুমিই হয়তো বুঝবে। তোমার মন বড় পরিষ্কার। কী জানো, এই চার ধারে যা কিছু আছে সবই যেন মানুষ। গাছটা, মাটিটা, ঘরটা সবই যেন বড় আপনার জন। দেশের বাড়িতে তাদেরই তো রেখে এসেছি কিনা!
এখানে এসে যে আবার নতুন করে সবাইকে পেলে। গাছ, মাটি, ঘর।
তা পেলাম। তবু পুরনোরা বেশি টানে। বাপ-দাদার ভিটে। পূর্বপুরুষদের বাস ছিল। ওর রকমটাই আলাদা। এই যে কৃষ্ণ একখানা গাছের ডাল হাতে করে এসেছে, কী বলব তোমাকে, সেই ডালখানাও যেন আমার সঙ্গে কত কথা কইল।
ওরকম হয়। তা বলে অমন চুপ মেরে যাও কেন? আমার যে ভয় করে।
ভয়! না, ভয়ের কি? পুরনো সব কথা মনে পড়ছিল। সামান্য সামান্য সব ঘটনা, তুচ্ছ সব কথা। তাই যেন মনটা রসস্থ হয়ে গেল।
তোমার বড় মায়া গো!
সেই জন্যেই তো দেহ ছাড়ে না।
বালাই ষাট। ওসব বলতে আছে?
কৃষ্ণকে দেশের বাড়ি দেখতে পাঠালাম। তা তার চোখ দিয়ে যেন আমারও দেখা। মনটা কিছু অস্থির হয়েছে তাই।
হ্যাঁ গো, তোমার যদি এতই মায়া তবে ঘুরে এসো না একবার। আজকাল কত লোক তো যাচ্ছে।
না না, সে ব্যাপারই নয়।
কেন বল তো!
গিয়ে কত পরিবর্তন দেখতে পাবো। সে কি ভাল লাগবে? মনটা খারাপ হয়ে যাবে। আমাদের কোঠাবাড়ি ছিল না, এখন হয়েছে। ঘরদোর, গাঁ সবই পাল্টে গেছে কত। ভাল লাগবে না। মন খারাপ হবে।
বিষ্ণুপদ ঘুরে ফিরে গিয়ে আম্রপল্লবটা দেখে। শুকিয়ে আসছে। তা হোক। ওটার গায়ে যেন পুব বাংলার আকাশ, বাতাস, মাটির রস, গন্ধ, গাঁয়ের ধুলো সব লেগে আছে। আম্রপল্লবটা হাতে নিয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকে বিষ্ণুপদ। নয়নতারাকে বলে, হ্যাঁ গো, এটা পুঁতলে কি গাছ হবে?
তাই কখনও হয়! তুমি তো আমার চেয়ে চাষবাস কম বোঝো না।।
তা বটে। কলমের গাছ করলে হত। বলে দিলে কৃষ্ণ সেই বাড়ি থেকে একটা গাছের চারাও আনতে পারত।
ওগো, অত পুরনো আমল আঁকড়ে থাকতে নেই।
জানি। মনটা বড় উচাটন।
বিষ্ণুপদ সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে এই আশ্চর্য নির্মাণ দেখে। ভাঙা ঘর লোপাট করে রাজপ্রাসাদ উঠল। দুনিয়াতে এরকমই সব হয় কাণ্ডকারখানা।
ও দাদু! বলে পটল হুড়মুড় করে সাইকেল নিয়ে এসে ঢুকল।
কি রে?
চলো।
কোথায় যাবো?
পুলিন দাদুর হয়ে গেল।
পুলিন! পুলিনের কী হল?
আজ টিউবওয়েল পাম্প করছিল সকালবেলায়। সেইখানেই স্ট্রোক।
বলিস কি?
বটতলা থেকে ডাক্তার এসে দেখে বলল, হয়ে গেছে।
দূর! কী যে বলিস! পুলিন বয়সে আমার ছোটো যে!
চলো দেখবে।
বিষ্ণুপদর হাতে পায়ে হঠাৎ একটা থরথরানি উঠল। ক্ষীণ গলায় সে ডাকল, নয়নতারা!
নয়নতারা পান-দোক্তা খাচ্ছিল দোতলার বারান্দায়। ডাকটা শুনতে পেল না। কানে একটু কম শোনে ইদানীং ও। পটল তার হেঁড়ে গলায় ডাক ছাড়ল, ও ঠাকুমা?
নয়নতারা মুখ বাড়িয়ে বলল, কী রে?
পুলিনদাদু মারা গেল সকালে। দাদুকে নিয়ে যাচ্ছি।
সর্বনাশ! বলিস কি?
বিষ্ণুপদ অসহায় মুখ করে বলল, আমার শরীরটা কেমন করছে। এসো তো!
নয়নতারা পক্ষিণীর মতো নেমে এল নিচে। বলল, কী হয়েছে তোমার?
একটু ধরো তো! ঘরে নিয়ে যাও।
পটল আর নয়নতারা বারান্দা অবধি আনতে পারল বিষ্ণুপদকে। বারান্দাতেই শুইয়ে দিতে হল। হাতে পায়ে কাঁপুনিটাই বড্ড বেশি।
ওরে, ডাক্তার ডেকে আন।
পটল গম্ভীর হয়ে বলল, ডাক্তারই তো পটল তুলেছে। বটতলা থেকে মিত্তিরকে ডেকে আনি ঠাকমা?
তাই যা দাদা। তাড়াতাড়ি যা।
পটল গেল।
কিন্তু বিষ্ণুপদ ততক্ষণে এগিয়ে পড়েছে অনেক। ধুলোপায়ে রাস্তা হাঁটছে। মাথার ওপর আলোভরা আকাশ, দু’ধারে ধানক্ষেত। খালধার। তারপর গাঁয়ের পথ। হাতে আম্রপল্লবটা ধরা। যাক, বহুকাল বাদে দেশে ফেরা হচ্ছে তাহলে!
[পার্থিব, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়]