মুষ্টিমেয় বাঙালি এখন আর চায়ের দোকানে তুফান তোলে না। তারা এখন ফেসবুকের পাতায় ভবিষ্যদ্বাণী বিলায়। কারোর দাবি দুইশ ত্রিশ আসন, কারোর দাবি তেষট্টি। সঙ্গে অমোঘ নির্দেশ—"স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন"। যেন ভোট গণনার দিন গণৎকারের ভবিষ্যৎবাণী না মিললে ওই স্ক্রিনশট দেখিয়ে পাড়ার রেশনে দু-কিলো চাল বেশি পাওয়া যাবে। অথচ প্রোফাইল নামের বানান ভুল। 'হার্টথ্রব হারু' লিখতে গিয়ে যে থ্রম্বোসিসে হারুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলে, তার কাছে রাষ্ট্রনীতির জটিল সমীকরণ আশা করা আর ডোডো পাখির কাছে ওড়ার কায়দা শেখা একই কথা।
এই 'স্ক্রিনশট' সংস্কৃতি আসলে আমাদের এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিশ্বাস করি, ডিজিটাল দলিলে যদি একবার লিখে রাখা যায় যে অমুক পক্ষ জয়ী হবে, তবে মহাকালের সাধ্য নেই সেই ফল বদলে দেয়। ১৬ আনা কনফিডেন্স। অথচ এই আত্মবিশ্বাসের মূলে কোনো যুক্তির লেশমাত্র নেই। আছে শুধু এক অদ্ভুত জেদ। অনেকটা ছোটবেলার সেই 'বাজেট' করা তর্কের মতো, যেখানে যুক্তি হারলে আমরা গলার জোর বাড়াতাম। এখন গলার জোরের বদলে এসেছে মোবাইল মেমোরি ভর্তি স্ক্রিনশট।
বাঙালির আইকিউ নিয়ে মাঝেমধ্যে সন্দেহ জাগাটা এখন আর অপরাধ নয়। আমরা কি সত্যিই এতই রিক্ত যে 'হারু' নামক এক রহস্যময় প্রোফাইলের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আমাদের আর্কাইভে সাজিয়ে রাখতে হবে? অদ্ভুত এক পরনির্ভরশীলতা। নিজের বাড়ির উঠোনে বসে পাড়ার পিন্টু বা টিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা এক বস্তু, আর নির্বাচনকে 'অমৃতলাল'-এর ম্যাজিক শো ভাবা অন্য বস্তু। আমরা চাকরির খবর খুঁজি না, কিন্তু ভোটের ফলের লটারিতে কে কটা পেল, তা নিয়ে বগল বাজাতে আমরা বিশ্বসেরা।
গণতন্ত্র মানে এখন মতামত প্রকাশের চেয়েও বেশি ‘প্ররোচনা’ দেওয়ার উৎসব। প্রত্যেকেই চাইছেন অন্যকে নিজের রঙের চশমাটা পরিয়ে দিতে। আর তার মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই ঐতিহাসিক তথ্যের দোহাই। কিন্তু মনে রাখা ভালো, ডিজিটাল স্ক্রিনশট আর ইভিএম-এর বোতাম এক নয়। একজনের কাছে যেটা রাজনৈতিক বিপ্লব, অন্যজনের কাছে সেটা নিছকই কৌতুক। আমরা আসলে সত্যের চেয়ে 'সারপ্রাইজ' বেশি ভালোবাসি। তাই মুখ্যমন্ত্রী পদের নাম না জানা থাকলেও, আমাদের হাতে স্ক্রিনশট রেডি থাকে।
আসলে বাঙালির এই চিরকালীন 'দাদাগিরি'র স্বভাবটাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ডালপালা মেলেছে। আমরা একে অপরকে মুখস্থ করিয়ে দিতে চাইছি যে পৃথিবীটা গোল নয়, বরং আমাদের মনমতো চ্যাপ্টা। এই প্রবল আত্মবিশ্বাসের চাপে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান ধুঁকছে। কাল ভোট মিটলে ছবিটা উল্টে যাবে কি না, তা নিয়ে বাজি ধরা যায়। কিন্তু এই যে প্রতিদিনের এই হাস্যকর কসরত, তা দেখে মাঝেমধ্যে সত্যি মনে হয়—তর্কের চেয়ে মুখে এক দলা ভাত গুঁজে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকাটাই হয়তো পরম নির্বাণ।
বাঙালি স্ক্রিনশট নিতে ভালোবাসে, কিন্তু নিজের ভুলগুলো এডিট করতে জানে না। গণতন্ত্র চলছে তার নিজের নিয়মে, আর আমরা চলছি আমাদের কাল্পনিক ডেটা প্যাকের জোরে। সময় যখন উত্তর দেবে, তখন এই স্ক্রিনশটগুলো শুধু মেমোরি কার্ডেরই ওজন বাড়াবে, বাঙালির মানসম্মানের নয়। অদ্ভুত এক জাতি আমরা, যারা বানান ভুলের ভিড়েও নিখুঁত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।