সে আসে না। আমি জানি। আসবে না। আজ রাতে যুদ্ধের আগের রাত, যেখানে সবাই প্রার্থনা করে, অস্ত্র ঘষে, বর্ম পরে, মন্ত্র পড়ে। আমি দাঁড়িয়ে বারান্দায়, হাতের তালুতে আগুন জ্বালিয়ে, সেই আগুনে পুড়িয়ে দিই তার নাম, যে নাম আমি কখনো উচ্চারণ করিনি, যে নাম আমার হৃদয়ের ভিতর খোদাই করা, রক্তাক্ত, যার প্রতিটি রেখা একটি যুদ্ধের দিন, একটি হারানো রাত, একটি অপূর্ণ আলিঙ্গন।
আমি জানি সে মরবে। আমি জানি আগামীকাল সূর্য ডুবার আগেই তার রক্ত মাটি ভিজাবে, তার রথের চাকা আটকে যাবে কাদায়, তার তীর ফুরিয়ে যাবে, তার হাত কাঁপবে, তার চোখ খুঁজবে আমাকে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব দূরে, একটি স্তম্ভের আড়ালে।আগামীকাল অনেক তারা নিভে যাবে, তাই আজ তারা জ্বলছে পুরো শক্তিতে, এক শেষ উৎসবের মতো, যেখানে অতিথিরা জানে এটাই শেষ রাত, তাই তারা হাসে, গান গায়, নাচে, পান করে, যতক্ষণ না ভোর হয়, যতক্ষণ না সূর্য ওঠে, যতক্ষণ না যুদ্ধ শুরু হয়।
তার রথ, তার ধনুক, তার বন্ধু, তার শপথ, তার নাম, তার পরিচয়, তার জন্মের গোপন রহস্য, যা সে জানে, কিন্তু মানে না, কারণ মানলে তাকে হতে হতো রাজা, আর রাজা হতে গেলে তাকে যুদ্ধ করতে হতো আমার স্বামীদের সাথে, যুদ্ধে জিতলে সে পেত আমাকে, সে জিতবে না, সে জিততে চায় না, সে চায় শুধু মরতে, মহানভাবে, দানবীরের মতো, শেষ দানটি দিয়ে – তার জীবন, যাতে তার নাম অমর হয়, আর আমার নাম তার সাথে জড়িয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়, ‘যে নারী তাকে ভালোবেসেছিল, কিন্তু কখনো বলেনি, কারণ বললে সব ভাঙে।’
আমি হাঁটতে শুরু করি কক্ষে, পায়চারি, পাগলের মতো, হাত বেয়ে যায় দেয়ালে, আঙুল খোঁজে ফাটল, আমি পাই শুধু পাথরের ঠাণ্ডা, শুধু আমার নিজের শ্বাসের গরম বাষ্প, আমি তখন আর দেখতে পাই না বাইরে, দেখি শুধু নিজের প্রতিবিম্ব, বিকৃত, ভাঙা, কাঁদছে, কিন্তু চোখ শুকনো, আগুনের মেয়ে কাঁদে না, আগুনের মেয়ে পুড়ে, ছাই হয়, ছাই উড়ে যায়, আর সেই উড়ে যাওয়ার নাম প্রার্থনা, যে কখনো ফেরত দেয় না চিঠি।
পাথর ঠাণ্ডা, আমার পিঠে লাগে সেই ঠাণ্ডা, আমি কাঁপি, কাঁপুনি থামে না, ভিতরে আগুন জ্বলছে, আর বাইরে বরফ, দুইয়ের লড়াই, দুইয়ের দ্বন্দ্ব, যার কোনো সমাধান নেই, শুধু আছে যন্ত্রণা, যা শব্দ করে না, যা চিৎকার করে না, যা নীরবে দেহকে খায়, কোষ থেকে কোষে, অস্থি থেকে অস্থিতে, যতক্ষণ না শুধু থাকে একটি খোলস। তুমি ঈশ্বরীর অংশ।”
দরজায় টোকা পড়ে। আমি চমকে উঠি। আমি উঠি, পা টেনে হাঁটি, দরজা খুলি। সেখানে কেউ নেই। শুধু বাতাস, পাতার শব্দ, একটি শিয়ালের ডাক, আর আমার নিজের ছায়া, চাঁদের আলোয় লম্বা, বিকৃত, যেন আমি দানব, যেন আমি রাক্ষসী, যেন আমি সেই নারী, আমি জিতেছি তার পরাজয়ে।
বাইরে সে। সে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ক্লান্তি, তার মুখে রক্তের দাগ, তার কাপড় ছেঁড়া, তার হাতে ধনুক নেই, তলোয়ার নেই, শুধু একটি ফুল, রক্তগন্ধা, কাঁটায় কাটা হাতে ধরা, সেই ফুল সে বাড়ায় আমার দিকে।“তুমি,” আমি বলি, আমার কণ্ঠ ফাটে, শব্দ বেরোতে চায় না, আটকে যায় দাঁতের ফাঁকে।
“তুমি এখানে? যুদ্ধের আগের রাতে? কেন? পাগল হয়েছ? তারা দেখলে তোমাকে, তারা মেরে ফেলবে।”
সে বলে, তার কণ্ঠ শান্ত, সমুদ্রের মতো, যার তলায় ঝড়, কিন্তু পৃষ্ঠ মসৃণ। “আমি এসেছি শেষবারের মতো দেখতে। আগামীকাল আমি মরব। আমি জানি। সারথি বলেছে। গুরু বলেছে। মা বলেছে। আমার ভাগ্য বলেছে। আমি মরব। কিন্তু মরার আগে, আমি চাই তুমি জানো – আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটাই শেষ রাত, এটাই শেষ ফুল।
“ভিতরে এসো,”
ভিতরে আসে। দরজা বন্ধ করি, আড়াত দিই। আমরা বসি মেঝেতে, মুখোমুখি, চোখে চোখ, কিন্তু চোখ নামাই, দেখলে পুড়ে যাই, আর এখন পোড়ার সময় নয়, এখন শুধু থাকার সময়, শ্বাস নেওয়ার সময়, একে অপরের শ্বাসের গন্ধ নেওয়ার সময়, যা মিষ্টি, যা তিক্ত, যা মৃত্যুর আগের নিঃশ্বাসের মতো, যা সবকিছুর স্বাদ ধারণ করে – বনের মাটি, চিতার ছাই, নদীর জল, পোড়া কাঠ, ভাঙা কলসি, হারানো শিশুর কান্না, পাওয়া বন্ধুর হাসি।
“কাল,” “কাল যখন তীর আমার বুকে বিঁধবে, আমি তোমার নাম নেব না, নাম নয়, নাম নেই, আমি তোমার চিহ্ন নেব, তোমার চোখের আগুন, তোমার কাঁটায় ফোটা পা, তোমার উপজাতীয় গান, আমি সেগুলো মনে করব, আর সেই মনে করার শক্তিতে আমি মরব না, আমি বাঁচব, চিরকাল।”
“তুমি পাগল,”
সে তার হাত বাড়ায়, আমার গালে রাখে। তার হাত গরম, রুক্ষ, তীরের দাগে ভরা। সেই হাত একবার আমার কপালে জল দিয়েছিল, নদীর ধারে, সেই প্রথমবার, যখন আমি ভাঙা কলসি নিয়ে বসেছিলাম, ক্লান্ত, একা, হারিয়ে। সেই হাত আজ আমার গালে, আমার অশ্রু মুছে দিচ্ছে, কিন্তু অশ্রু তো বরফ, বরফ গলে না।
আমি তার হাত ধরি, আমার দুহাতের মাঝে রাখি। তার হাত কাঁপে, আমার হাত কাঁপে, আমরা দুই কাঁপুনি মিলে তৈরি করি একটি ছন্দ, একটি স্পন্দন, যা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়, প্রবল হয়, ঝড়ে পরিণত হয়, সেই ঝড় আমাদের চারপাশে ঘুরতে থাকে, চুল উড়ায়, কাপড় উড়ায়, মোমবাতি নিভিয়ে দেয়, অন্ধকার ঘন হয়, সেই অন্ধকারে আমরা শুধু অনুভব করি একে অপরকে, হাতের স্পর্শ, নিঃশ্বাসের গরম, হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন, আর সেই স্পন্দন এক হয়ে যায়, একটি তাল, একটি বীট, যা বলে, “এখন সময়, এখন মুহূর্ত, এখন এসো, এক হও, পুড়ে যাও, ছাই হও, উড়ে যাও, কারণ কাল আর সময় নেই, কাল যুদ্ধ, কাল মৃত্যু, কাল বিচ্ছেদ, আজ শুধু আজ, এই মুহূর্ত, এই অন্ধকার, এই স্পর্শ, এই ভালোবাসা, যা নামহীন, যা চিরন্তন, যা একবার পেলে আর হারানো যায় না, কারণ হারালেও থাকে, স্মৃতিতে, বেদনায়, প্রতিটি শ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের আগে পরে, যতদিন বাঁচি, ততদিন জ্বলে, আর মরলে মিলিয়ে যায় সেই অনন্ত আলোতে, যেখানে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, কোনো পাঁচ নেই, কোনো এক নেই, শুধু আছে এক, যার নাম ভালোবাসা, যার রূপ আগুন, যার গন্ধ রক্তগন্ধা, যার স্পর্শ কাঁটা, যার স্বাদ অশ্রু, যার শব্দ নিঃশব্দতা।”
আবার সেই ভালোবাসা, যার কোনো নাম নেই, কিন্তু যার জন্য আমি বাঁচি, আমি মরি, আমি আবার জন্মাই, চিরকাল, অনন্ত, এক নিঃশ্বাসে, এক স্পর্শে, এক দৃষ্টিতে, যা কখনো ভুলব না, যা কখনো মনে রাখব না, কারণ স্মৃতি ও বিস্মৃতির মাঝে সীমানা নেই, শুধু আছে এই মুহূর্ত, এই কক্ষ, এই ফুলের পাপড়ি, এই রক্তের ফোঁটা, এই আগুন, এই ভালোবাসা, এই আমি, এই সে, এই আমরা, চিরকাল, এক মুহূর্তের জন্য।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।