গণতন্ত্রের খুন্তি
অয়ন মুখোপাধ্যায়
আমাদের পাড়ায় হরিপদবাবু বলে এক ভদ্রলোক আছেন। ভদ্রলোক বলছি, কারণ তিনি নিজেই নিজেকে ভদ্রলোক বলে পরিচয় দেন। অন্যেরা কী বলে, তা নিয়ে তিনি বিশেষ কিছু ভাবেন না। সকালে দাঁত মাজতে মাজতেই দেশ বাঁচান, দুপুরে ভাত খেতে খেতেই গণতন্ত্র কে সরিয়ে দেন, আর সন্ধেবেলা চা খেতে খেতে সরকার বদলে ফেলেন। পরদিন আবার নতুন করে বসান।
এহ্যানো হরিপদবাবুর একটা বিশেষ গুণ আছে। পৃথিবীর যে-কোনও জটিল ঘটনার তিনি সহজ ব্যাখ্যা করে দিতে পারেন। পাড়ার মুদি দোকানে চিনি নেই—বিশ্বপুঁজির চক্রান্ত। পাশের বাড়ির বিড়াল তিনদিন ধরে ডাকছে—বন্যপ্রাণী সঙ্কট। একদিন নিজের ছাতা হারালেন। বললেন, “এটা নিছক ছাতা চুরি নয়, এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রের ওপর আঘাত।”
সেদিন বাজার থেকে ফিরছিলাম। হাতে পটল-টমেটো, আর মাথায় হালকা অন্ধকার। মোড়ে হরিপদবাবু আটকালেন। চোখে সেই জ্যোতি—আজই দেশ শেষ শেষ হয়ে যাবে আচমকা হরিপদ বাবু আমাকে বললেন বললেন, “তিনটে বড় ভুল হয়েছে।”
আমি চুপ করে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, “এক—মানুষকে বোকা ভাবা। দুই—সবাইকে খুশি করতে গিয়ে কাউকেই খুশি করতে না করা। তিন—ফাঁদ চিনতে না পারা।”
আর দেরি নয় ছুটির দিন আমরা সোজা চলে গেলাম ‘মা তারা টি স্টল’-এ। পাড়ার ভাষায়—মন্ত্রিসভা। নিতাই চা দেয়, বাকিরা দেশ চালায়। হাজির নির্মলবাবু, গণেশ মাছওয়ালা, ভীম।
হরিপদবাবু বললেন, “মানুষকে বোকা ভাবা সবচেয়ে বড় ভুল। অন্যায় হলে মানুষ চুপ করে থাকে, কিন্তু ভুলে যায় না। অপমান জমা রাখে। মনে রাখবেন যে অত্যাচার করে সে ভুলে যায় কিন্তু যে অত্যাচারিত হয় সে কখনো ভুলতে পারে না”
নির্মলবাবু চশমা নামিয়ে বললেন, “মানে সুদে-আসলে ফেরত দেয়?”
হরিপদবাবু মাথা নাড়লেন, “ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায়।”
গণেশ আস্তে করে বলল, “গৃহস্থের রাগ ছোট করলে বাজারে টিকতে হয় না।”
চা এল। হরিপদবাবু বললেন, “দ্বিতীয় ভুল—সবাইকে খুশি করতে যাওয়া। একটু ধর্ম, একটু সেকুলার, একটু এই, একটু ওই—শেষে দাঁড়ায় কী? মিক্সড ভেজিটেবল তরকারি।”
ভীম হেসে বলল, “আমরা তো সবই সবকিছু খাই দাদা।”হরিপদবাবু বললেন, “খাওয়া আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়। পেট অনেক কিছু মানে, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় মাথা আলাদা অঙ্ক কষে।”
তিনি একটু ঝুঁকে এলেন। বললেন, “তৃতীয় ভুল—ফাঁদ না চেনা। তালিকায় নাম নেই, কাগজের জট এই ধরুন এসআইআর—এগুলো নিছক গাফিলতি নয়। এখন কাগজই বাঘ।”
নিতাই বলল, “আমার খুড়তুতো ভাই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ঘুরছে।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ। সত্যি কথা খুব ছোট হয়, তাই বেশি লাগে।
ক্লাবের ভেতরে পটলা বসে ছিল। বেকার, কিন্তু ব্যস্ত খুব। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কোন দলে?”
সে বলল, “উন্নয়নের দলে।”
আমি বললাম“কোথায় উন্নয়ন আর কারই বা উন্নয়ন?”
সে হাসল, “আমার।”
পটলা বলল, “ভোট এখন মতাদর্শ নয়, পুরোটাই ম্যানেজমেন্ট। কে বুথে থাকবে, কে বাইক চালাবে, কে বুড়ো মানুষ নিয়ে যাবে—এইটাই আসল।” আর দেখছেন না সব পার্টি কেমন আইপ্যাক এর মত টিম রাখছে।
আমি বললাম, “সাধারণ মানুষ?”
পটলা বলল, “সাধারণ মানুষ সে সব বোঝে। কিন্তু ভোটের দিন তাকে ঘিরে রাখি আমরা।”
এই ‘আমরা’ শব্দটা শুনে অদ্ভুত ঠান্ডা লাগল। কারণ গণতন্ত্রে আমরা এই ছোট্ট শব্দটাই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বড় এবং হেঁয়ালি কর।
দুপুরে হরিপদবাবুর বাড়ি। হরিপদ বাবু স্ত্রী শৈলবালাদেবী ভাত বাড়ছেন। হরিপদবাবু বলছেন, “বুঝলে শৈল এবার আর পুরনো প্রতিশ্রুতি কাজ করছে না। মানুষ জিজ্ঞেস করছে—এরপর কী?”
শৈলবালাদেবী থালা নামিয়ে বললেন, “মানুষ অনেকদিন ধরেই জিজ্ঞেস করছে। তুমি আজ শুনছ।”
তিনি থামলেন না। বললেন, “আলুর দাম বাড়ে, গ্যাস বাড়ে, সংসার কষ্টে চলে—এই বাস্তব টা না বুঝলে রাজনীতি বোঝা যায় না।”
হরিপদবাবু চুপ। কারোর হরিপদবাবু জানেন এই বাড়ির আসল বিরোধী দল একজনই—শৈলবালাদেবী।
ভোট উপলক্ষে পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হল—“গণতন্ত্র ও গীতাঞ্জলি সন্ধ্যা”। নেতা এলেন। এবার বক্তৃতা দেওয়ার পালা সবশেষে নেতা বারবার করে বললেন, “আমরা উন্নয়ন করেছি।”
পেছন থেকে কেউ বলল, “কোথায় উন্নয়ন?”
নেতা বললেন, “সব জায়গায়।”
হরিপদবাবু ফিসফিস করে বললেন, “যেখানে দেখা যাচ্ছে না, সেখানেই বেশি।”
ভোটের আগের দিনগুলোতে পাড়া ব্যস্ত। ভীমকে সকালে গেরুয়া, বিকেলে সবুজ, রাতে লাল পতাকার তলায় দেখলাম।
বললাম, “তুই কীসের প্রতীক?”
সে বলল, “আমি জোট রাজনীতির।”
ভোটের দিন লাইন পড়েছে। বয়স্কা মহিলারা দাঁড়িয়ে, যুবকেরা বাইক নিয়ে ঘুরছে, পটলার চোখে হিসেব।
হরিপদবাবু ধুতি পরে বেরিয়েছেন। বললেন, “সব ভোট একরকম হয় না। কিছু মানুষ ভোট দেয় আশায়, কিছু মানুষ ভোট দেয় ভোট রাগ করে, কিছু ভোট হিসেবের। আর কিছু ভোট শুধু বলে—আপনাদের উপর আর ভরসা নেই।”
সন্ধে নামল। ফল বেরোয়নি, কিন্তু সবাই মনে মনে নিজের অঙ্ক কষছে।
রাতে শৈলবালাদেবী হরিপদ বাবুকে বললেন, “দেশ নিয়ে ভাবতে সবাই ভালোবাসে। জল তোলার মেশিন খারাপ হয়ে গেলে তিনদিন পড়ে থাকে। তবু দেশ বাঁচাবে।” এরপর ঘর থেকে বেশ কিছু ঝনঝন দুমদাম শব্দ আসছিল সেগুলো আমি আর বলছি না। যাইহোক কিছুক্ষণ পর হরিপদ বাবু বাইরে এলেন
আমি হেসে বললাম, “তা হলে বদলাবে কী?”
তিনি দার্শনিকের মত উত্তর দিলেন, “বদলায় বদলায় সবই বদলায় তবে ধীরে। আর ভুল লোকদের দেখে ঠিক লোকের দরকার বোঝা যায়।”
ক্লাবের সামনে ছেলেরা খিচুড়ি খাচ্ছে। কারও গায়ে গেরুয়া, কারও সবুজ, কারও টি-শার্টে চে। প্লাস্টিকের প্লেটে খিচুড়ি, মুখে রাজনীতি।
হঠাৎ মনে হল—এই রাজ্যটাই যেন একটা হাঁড়ি। চাল-ডাল আছে, নুন কখনও কম, কখনও বেশি। কেউ বলে ঐতিহ্য, কেউ বলে বিপর্যয়। তবু সবাই খায়। সামনে কেউ গোপনে কিন্তু সবাই এখন খাচ্ছে।
পার্থক্য শুধু একটাই—এই খিচুড়ি নিজে নিজে নাড়ে না। কেউ না কেউ খুন্তি ধরে নাড়ায়। আর আমরা বেশিরভাগ সময় হাঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে শুধু গন্ধ নিই, ঝগড়া করি, তারপর আবার প্লেট বাড়াই।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।