এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বনের গর্ভে যজ্ঞের জ্বর 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • শব্দ দিয়ে শুরু না, গন্ধ দিয়ে শুরু। পোড়া কাঠের গন্ধ। গলা ঘির গন্ধ। রক্তের গন্ধ। যে রক্ত তখনো পড়েনি - কিন্তু জানি পড়বে। যজ্ঞ মানে বলি। মৃত্যু। মৃত্যু মানে শুরু। আমি সেই গন্ধের ভিতরে শুয়ে আছি। চোখ বন্ধ। হাত পা বাঁধা না। বাঁধা না, মুক্ত। কিন্তু আমি নড়ি না। আমি অপেক্ষা করি সেই মুহূর্তের - যখন মন্ত্র শেষ হবে। পুরোহিত আমার মাথায় হাত রাখবে। যখন আগুন জ্বলবে, এবং আমি ধোঁয়ায় মিশে যাব - অথবা জেগে উঠব নতুন রূপে।

    জেগে উঠি। চোখ খুলি। একটি উঁচু ছাদ। সোনার কাজ। দেবদেবীর মুখ তারা হাসছে - তারা তাকিয়ে। যেন জানে আমি মিথ্যে। নকল।। সোনার তৈরি একটি পুতুল - ধর্মের নামে যাকে বলি দেওয়া যায়। যাতে রাজা পায় পুত্র। শত্রু মরে। পৃথিবী শান্ত হয়। হাসতে চাই - হাসি আটকে যায় গলায়। আমার গলা শুকনো। তৃষ্ণার্ত। আর সেই তৃষ্ণা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বনের দিকে যেখানে - ঝরনা ছিল। আমি পান করতাম হাতের কূপ করে। জল এতটাই স্বচ্ছ যে তলায় পাথর দেখা যেত। আর সেই পাথরের গায়ে শ্যাওলা। নরম। পিচ্ছিল ও জীবন্ত।
    মা ছিল না। ছিল বুড়ি। যে আমাকে ডাকত "আগুনের পোড়া"। বলত, “তুই যজ্ঞ থেকে আসিসনি। তুই আসিসনি বনের আগুন থেকে। যে আগুন পুড়িয়ে মারে - কিন্তু বীজ পোড়ায় না। বীজকে শক্ত করে। করে উর্বর। সেই আগুন। তুই পুড়িয়ে দিবি সব। যা সোনার, যা মিথ্যের। যা ধর্মের। ”

    তাকে বিশ্বাস করতাম। সে মারা গেছে। যখন আমি ছোট। যখন আমি শিখিনি কিভাবে বাঁচতে হয় নিজের আগুনে। তার মৃত্যুর পর আমি ঘুরেছি বনে – একা - খালি পায়ে - কাঁটা ফুটেছে। আমি টেনে বের করেছি, রক্ত। সেই রক্ত মাখিয়েছি গাছের গুঁড়িতে। গাছ বেড়েছে। ফল দিয়েছে - আমি খেয়েছি, বেঁচে আছি। তারপর এল রাজার লোক, তারা আমাকে দেখল, তারা বলল, “এটাই সেই। এটাই যজ্ঞের কন্যা।” আমি চিৎকার করেছিলাম, “আমি যজ্ঞের না, আমি বনের!” তারা শোনেনি। তারা আমাকে টেনে নিয়েছিল। সাজিয়েছিল। দিয়েছিল নাম। দিয়েছিল স্বামী। পাঁচজন। যেন একের বেশি দিলে আমার আগুন ভাগ হয়ে যায়। শান্ত হয় - নিভে যায়। আগুন ভাগ হয় না। আগুন জ্বলে একই তীব্রতায় - পাঁচটি চুলায়। যদি কাঠ থাকে। কিন্তু আমার কাঠ ফুরিয়ে আসছে, তারা আমাকে জ্বালাতে জানে না, তারা শুধু জানে পোড়াতে।

    প্রথম স্বামী। সে রাজা। সে বড়। দাড়ি লম্বা। চোখ গম্ভীর, হাতে দন্ড। আমার দিকে তাকায় মনে হয় আমি একটি শাসন - একটি নিয়ম। একটি পালনীয় কর্তব্য। সে রাতে আসে। করে যা কর্তব্য। তারপর চলে যায়। নিঃশব্দ - যেমন নদীর ঢেউ ভাঙে। কিন্তু ফিরে আসে না। আমি তার শরীর স্পর্শ করি - বালির মতো। আলগা - বিচ্ছিন্ন। তার চোখে নিজেকে খুঁজি, পাই না। শুধু পাই রাজ্যের মানচিত্র। যুদ্ধের পরিকল্পনা। প্রজার তালিকা।

    দ্বিতীয় স্বামী। সে শক্তিশালী। তার বাহু বৃক্ষের শিকড়ের মতো। স্বর গর্জনের মতো। সে আমাকে ধরে আমাকে চেপে ধরে। যেন আমি একটি অস্ত্র। যা ভাঙবে না। সে বলে, “তুমি আমার।” আমি বলি, “আমি কারও না।” সে হাসে পাথুরে হাসি। যা ফাটে না। তার ভালোবাসা বজ্রপাতের মতো – ক্ষণিক – তীব্র। কিন্তু শুধু পোড়ায়। উর্বর করে না।

    তৃতীয় স্বামী। সে সুন্দর। তার মুখ চাঁদের মতো, তার চুল কালো মেঘের মতো - নাচ জানে। গান জানে। আমাকে নিয়ে যায় বাগানে ফুল দেখায় - পাখি শোনায়। কিন্তু তার চোখে আমি দেখি শুধু প্রতিবিম্ব, নিজের সৌন্দর্যের প্রতিবিম্ব - আমার আগুন নয়। আমার বন নয়। সে আমাকে ভালোবাসে যতটা ভালোবাসে তার তলোয়ার। যা ঝলমল করে। কিন্তু কাটে না।
    চতুর্থ স্বামী। সে রসিক। তার কথায় হাসি, তার চালে লাবণ্য। সে আমাকে বলে গল্প। গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় রহস্য। আমি হাসি। ভুলে যাই আমি কে। গল্প শেষ হলে - চলে যায়। অন্য গল্পের সন্ধানে। আমাকে ফেলে যায় এই কক্ষে। এই প্রাসাদে - ফাঁকা শূন্যতায়।

    পঞ্চম স্বামী। সে কনিষ্ঠ। মুখে এখনও শিশুর চিহ্ন। চোখে বিস্ময়। কৌতূহল। আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি সত্যিই আগুন থেকে এসেছ?” আমি বলি, “হ্যাঁ।” সে বলে, “আমি ভয় পাই।” আমি বলি, “ভয় পেয়ো না। আগুন শুধু নেয় না, দেয়ও।” সে বুঝতে পারে না - শুধু আমার হাত ধরে। তার গরম হাত - যা আমার হাতের তাপ শোষণ করে, আমাকে ঠাণ্ডা করে।

    পাঁচজন। পাঁচটি চুলা। আগুন এক। আমার ভালোবাসা এক। আর সেই এক আমি দিয়েছি তাকে - যে নেই এদের মধ্যে। যে দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তে। সভার শেষ সারিতে। হাসে যখন অন্যরা হাসে। কিন্তু তার হাসির নিচে আছে নোনতা জল। যা সে কখনো ফেলে না। সে যোদ্ধা। যোদ্ধা কাঁদে না, শুধু হাসে - তিক্ত হাসি। আমার হৃদয়ে লাগে তীরের মতো।

    আমি তাকে চিনি। তাকে চিনেছি প্রথম দর্শনে। সেই নদীর ধারে - যখন সে জল দিয়েছিল ভাঙা কলসিতে। তার হাতের স্পর্শ তখনও লেগে আছে আমার কাঁধে - দাগের মতো - একটি পোড়া চিহ্নের মতো। কখনো মিলায় না। আমি ঢাকি শাড়ির আঁচলে। কিন্তু রাতে - যখন একা আমি, সেই দাগে আঙুল বুলাই। অনুভব করি তার উপস্থিতি। এখানে সে, যেন আমার পাশে শুয়ে আছে - আমরা দুই আগুন, একসঙ্গে জ্বলছি। একে অপরকে খাচ্ছি। নিভছি না - শুধু উজ্জ্বল হচ্ছি। আরও উজ্জ্বল। যতক্ষণ না আমরা সেই আলো হয়ে যাই যা কেউ নিভাতে পারে না।

    সে দূরে। শত্রুপক্ষে। সেই পাঁচজনের শত্রু - যে পাঁচজন আমার স্বামী। আমি ছেঁড়া ডাল। দুই আগুনের মাঝে। দুই বনের মাঝে। দুই সত্যের মাঝে। আমার নিজের সত্য কোথায়? আমার সত্য কি? এই প্রাসাদের দেয়ালের মধ্যে? না, বনের গভীরে -- যেখানে সে ঘুরে বেড়ায়, তার রথে সারথির সাথে -- যে তাকে পথ দেখায়। বলে, “দেখ, ঐ যে বনের মেয়ে, যে অপেক্ষা করছে, সে আটকা প্রাসাদে। সোনার শিকলে। পাঁচ পুরুষের কর্তৃত্বের নিচে।”

    আমি দম বন্ধ হই। প্রতিদিন। প্রতিরাতে। যখন তারা আসে। একজন - একজন করে, তাদের কর্তব্য পালন করে। আমি হাঁসফাঁস করি বাতাসের জন্য- জলের জন্য- তার স্পর্শের জন্য। আমি জানালার গ্রিল ধরি। বাইরে তাকাই। দেখি দূরের পাহাড় - মেঘ জমে - বৃষ্টি আসে, সেই বৃষ্টি ভিজিয়ে দেয় মাটি। মাটি ফোটায় ঘাস। খায় হরিণ। সেই হরিণ শিকার করে সে। একা। তার ধনুক হাতে। তীর লক্ষ্যে। চোখে সূর্যাস্তের লাল আভা।

    আভায় পুড়ি। আমি পুড়ি। ছাই হই। উড়ে যায় বাতাসে, সেই বাতাস তার গাল ছুঁয়ে যায়। সে টের পায়। মাথা ঘুরায়। শূন্যতা। কিন্তু জানে আমি আছি। সব জায়গায়। আমি বাতাস। আগুন। জল। মাটি। সেই বনের ডাক - যা তাকে টানে। বলে, “ এসো। আমাদের সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। যখন সব পুড়ে যাবে - সভ্যতার ছাই উড়ে যাবে - তখন আমরা দেখা করব - নিঃশব্দ বিশাল মাঠে। নিঃশব্দ রাতে আর কোনো নাম থাকবে না। বাধা থাকবে না। শুধু থাকবে দুই আগুন। মিলিত। এক।”

    আমি অপেক্ষা করি। আগুন জ্বালাই রান্না করি। খাওয়াই। আমার স্বামী। যারা আমার শত্রু। দেহ পায়। মন না। তাদের চোখে আগুন দেখি না। শুধু কাঠ দেখি। পুড়বে। ছাই হবে। বাতাসে মিশবে। আর আমি সেই বাতাস। যা চিরকাল - অনন্ত। তাদের স্মৃতির চেয়েও বড়, রাজ্যের চেয়েও ব্যাপ্ত। আগুনের মত। যা আমি। সে। আমরা।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০739942
  • " ততঃ কুমারী বেদিমধ্যাৎ সমুথিতা।
    সুভগায় দর্শনীয়... নীলোৎপলসমো গন্ধো
    যস্যাঃ ক্রোশাৎ প্রবায়তি।"
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন