এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জলঙ্গীর বাঁকে নধরের ভেলা: এক অস্তিত্বের মন্থর প্রতিবাদ

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • জলঙ্গীর বাঁকে নধরের ভেলা: এক অস্তিত্বের মন্থর প্রতিবাদ

    আজ কৃষ্ণনগর পৌরসভার হলে ‘নধরের ভেলা’ সিনেমাটি দেখার সুযোগ হলো। প্রথাগত মাল্টিপ্লেক্সের চাকচিক্য ছেড়ে মিউনিসিপ্যাল হলের এই সাদামাটা পরিবেশে সিনেমাটি দেখা যেন গল্পের ‘নধর’-এর মতোই এক সহজ ও মাটির কাছাকাছি অভিজ্ঞতা। তবে এই ছবি দেখার পর আমার মনের ভেতর কিছু অন্যরকম ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

    সিনেমাটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব আমার কাছে মনে হয়েছে এর ‘ধীরতার রাজনীতি’। যখন পুরো পৃথিবী জেতার জন্য দৌড়াচ্ছে, তখন নধর যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—তাল মেলাতে না পারা কোনো অপরাধ নয়। অভিনেতা অমিত সাহার অসামান্য অভিনয় নধর চরিত্রটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি, কথা বলার ধীর ছন্দ আর চোখের সেই উদাসীন অথচ মায়াবী চাউনি প্রমাণ করে যে, নিজের মন্থরতায় ডুবে থাকাটাও একটা ব্যক্তিগত বিপ্লব। বিশেষ করে হারুর ওপর সেই আকস্মিক আক্রমণের মুহূর্তে অমিতের অভিব্যক্তির পরিবর্তন এক কথায় অবিশ্বাস্য।

    তবে নধরের এই নীরব লড়াইকে সার্থক করতে পাল্টা যে নিষ্ঠুরতার প্রয়োজন ছিল, তা পূর্ণমাত্রায় এনে দিয়েছেন হারু রূপী ঋত্বিক চক্রবর্তী। তাঁর তুখোড় অভিনয় গুণ হারু চরিত্রটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা সিনেমাটিকে একটি নিখুঁত ভারসাম্য দিয়েছে। এছাড়া প্রিয়াঙ্কা সরকার থেকে শুরু করে প্রতিটি অভিনেতা-অভিনেত্রী স্বতন্ত্রভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখেছেন, যা ছবির বিশ্বাসযোগ্যতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

    শান্ত মানুষের এই ‘রক্তিম বিস্ফোরণ’ যেন জলঙ্গী নদীর শান্ত জলের নিচে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর স্রোতের বহিঃপ্রকাশ। আজ জলঙ্গীর স্রোত হারিয়েছে, তার গতি মন্থর হয়ে গেছে বলে মানুষ তাকে নদী না ভেবে এক স্থবির জলাশয় মনে করে, তার ওপর অনবরত অত্যাচার চালিয়ে যায়। নধরের জীবনটাও ঠিক সেই মন্থর জলঙ্গীর মতোই—যাকে সবাই ‘অকেজো’ মনে করে অবহেলা ও শোষণ করে চলেছে। কিন্তু মানুষ ভুলে যায়, এই শান্ত নদীই যেমন একদিন মরা স্রোত ছাপিয়ে বন্যায় সব তচনছ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, নধরের ওই আকস্মিক হিংস্রতাও ছিল শোষণের বিরুদ্ধে ঠিক তেমনই এক প্রাকৃতিক ও অনিবার্য প্রলয়।

    সিনেমায় সার্কাসের সেই বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের দৃশ্যটি বারবার ফিরে আসা হয়তো অনেকের কাছে ‘বোরিং’ বা একঘেয়ে লাগতে পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, বেহুলার সেই সাজ আর নাচ আসলে আমাদের প্রাচীন লোকগাথাকে বাজারে ‘পণ্য’ হিসেবে বিক্রি করার যান্ত্রিকতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। শ্যামার কাছে ওই নাচ ভক্তি নয়, বরং এক ঘানি টানা শ্রম। এই একঘেয়েমিই আসলে তার জীবনের আসল ট্র্যাজেডি।

    তবে এই রুক্ষতার মাঝেও নধর ও শ্যামার প্রেম এক পশলা বৃষ্টির মতো। অনেকেই হয়তো অবাক হন—শ্যামার মতো চঞ্চল এক নারী কেন নধরের মতো ‘অকেজো’ মানুষের প্রেমে পড়ল? আসলে এর উত্তর লুকিয়ে আছে জলঙ্গী নদীর গভীরেই। সমাজ যেমন জলঙ্গীর মন্থরতাকে তার ‘স্থবিরতা’ ভেবে তাকে অবহেলা করে, কিন্তু তার শান্ত জলের নিচে লুকিয়ে থাকা শীতল শান্তিকে বুঝতে পারে না; শ্যামাও ঠিক তেমনই নধরের সেই ‘ধীরতার’ গভীরে এক অদ্ভুত নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছিল। গতির নেশায় উন্মত্ত এই সমাজে সবাই যখন কেবল দখল করতে চায়, তখন নধর তাকে দিয়েছিল এক নিভৃত আশ্রয়।

    ঠিক এইখানেই সিনেমার চরিত্র শ্যামার সাথে বাস্তবের ‘জলঙ্গী নদী সমাজ’-এর লড়াই একবিন্দুতে মিলে যায়। সমাজ যখন অবহেলায় নদীটিকে মৃতপ্রায় করে রাখছে, তখন এই সংগঠনের মানুষগুলোই শ্যামার মতো ভালোবেসে আগলে রাখছে তাদের প্রিয় জলঙ্গীকে। জলঙ্গী নদী যেমন নিঃশব্দে সব অত্যাচার সহ্য করেও দুকূল ছাপিয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে দেয়, নধরের সেই নির্ভেজাল অস্তিত্বই শ্যামাকে তার গতির জগত ত্যাগ করে ওই শান্ত ভেলায় এসে বসতে বাধ্য করেছে।

    সবচেয়ে বেশি বিদ্ধ করেছে নধরের বাড়ি হারানোর ঘটনাটি। বাড়িটি যখন মদের ঠেকে পরিণত হলো, তখন সেটি কেবল সম্পদ দখল ছিল না, ছিল নধরের পবিত্র স্মৃতির অপবিত্রকরণ। এই দৃশ্যটি দেখায় যে, আমাদের সমাজ কতটা নিষ্ঠুরভাবে একজনের সত্তাকে মুছে দিতে পারে। বাড়িটি যখন তার পবিত্রতা হারালো, তখনই নধর আক্ষরিক অর্থে ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে পড়ল।

    এই সিনেমাটি মহল্লায় মহল্লায় বা মিউনিসিপ্যাল হলের মতো সাধারণ জায়গায় দেখানোর যে উদ্যোগ পরিচালক নিয়েছেন, তা আমাকে ভীষণভাবে বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। বাদল সরকার যেমন থিয়েটারকে সাধারণ মানুষের আঙিনায় নিয়ে গিয়েছিলেন, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যও যেন সিনেমার সেই আভিজাত্যের দেয়ালটা ভেঙে দিলেন। এর মধ্যে আমি খুঁজে পাই আমাদের গ্রামবাংলার সেই পুরনো যাত্রাপালার ঐতিহ্য।

    সিনেমার যবনিকা পড়লে এক অনন্য মুহূর্তের সৃষ্টি হলো। পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য যখন পর্দার কুশীলবদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন, তখন মনে হলো সিনেমা আর বাস্তব মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। আর দর্শকদের অনুরোধে শিল্পী সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায় যখন খালি গলায় গাইলেন— "জলো নাই,.... মাছো নাই...", তখন এক অদ্ভুত অলৌকিক স্তব্ধতা তৈরি হলো। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই সেই উদাত্ত কণ্ঠের সুর নধরের নিঃসঙ্গতাকে আমাদের সবার হৃদয়ে ছড়িয়ে দিল। সেই সুরের রেশ প্রেক্ষাগৃহের গণ্ডি ছাড়িয়ে কৃষ্ণনগরের রাতের রাস্তা হয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত বয়ে এসেছে। ‘নধরের ভেলা’ আমায় শিখিয়ে দিয়ে গেল—সব হারিয়েও নিজের মতো করে নিজের ভেলায় ভেসে থাকাটাই হলো আসল টিকে থাকা।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন