— যাঁরা সংখ্যা দিয়ে কবিতা লেখেন, তাঁদের জন্য একটি বিনীত নিবেদন।
---
গল্পটা শুরু হয় যেখানে
তৃণমূল সমর্থকদের একটি বিশেষ প্রতিভা আছে—তাঁরা রাজ্যের উন্নয়নের এমন একটি ছবি আঁকেন, যেখানে আলো এত উজ্জ্বল যে ছায়াগুলো আর দেখাই যায় না। Kanyashree আছে, Lakshmir Bhandar আছে, Duare Sarkar আছে—সব আছে। শুধু নেই পরিসংখ্যান, প্রেক্ষাপট, এবং সততার সামান্য একটু আলো।
তো চলুন, সেই আলোটা একটু জ্বালাই।
---
১. অর্থনীতি: "বাংলা এগিয়ে চলেছে"—কোথায়?
TMC-র আখ্যান: GSDP বাড়ছে, বাংলা উন্নতির পথে।
বাস্তবতা:
পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে নিচে। RBI-র রাজ্য অর্থনীতির তথ্য অনুযায়ী, বাংলার মাথাপিছু NSDP দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে মাঝামাঝি থেকেও নিচে—মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা তো দূরের কথা, বেশ কিছু "পিছিয়ে পড়া" বলে পরিচিত রাজ্যও এগিয়ে।
আরও অস্বস্তিকর তথ্য: বাংলা ভারতের সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলির একটি। ২০২৪-২৫ সালের বাজেট অনুযায়ী রাজ্যের মোট ঋণ ৬ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে—যা রাজ্যের GSDP-র প্রায় ৩৮-৪০%। RBI-র Fiscal Health Index-এ বাংলা বারবার দুর্বল শ্রেণিতে।
প্রশ্ন যেটার উত্তর নেই: যে রাজ্যের সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নামে ঋণ নিয়ে আজকের ভর্তুকি দেয়—সেটাকে কি "উন্নয়ন" বলে, না "নির্বাচনী বিনিয়োগ" বলে?
---
২. কর্মসংস্থান: "চাকরি হচ্ছে"—কোথায় যাচ্ছে সেই চাকরি?
TMC-র আখ্যান: শিল্প আসছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে।
বাস্তবতা:
CMIE (Centre for Monitoring Indian Economy)-র তথ্য বলছে, বাংলার বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের কাছাকাছি বা বেশি থাকে বেশিরভাগ সময়।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় কথা বলে মানুষের পায়ের গতিপথ। বাংলা থেকে কেরালা, দিল্লি, মহারাষ্ট্রে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারির পরের তথ্যেও পরিযান বৃদ্ধির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
সবচেয়ে তীব্র তথ্য: SSC (School Service Commission) কেলেঙ্কারি। ২৫,৭৫৩টি সরকারি শিক্ষকের পদে নিয়োগ দুর্নীতি—যেখানে মেধার বদলে টাকা চলেছে। লক্ষাধিক যোগ্য প্রার্থী বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেফতার, তাঁর ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে উদ্ধার প্রায় ৫০ কোটি টাকা নগদ।
প্রশ্ন: "চাকরির বাজার তৈরি করছি"—এই দাবি কি তাঁরাই করছেন, যাঁদের আমলে চাকরি কেনাবেচার বাজার তৈরি হয়েছিল?
---
৩. নারী সুরক্ষা: Kanyashree-র দেশে
TMC-র আখ্যান: Kanyashree, Rupashree—নারী ক্ষমতায়নে বাংলা দেশের মডেল।
বাস্তবতা:
NCRB (National Crime Records Bureau)-র বার্ষিক তথ্য ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষ রাজ্যগুলির মধ্যে থাকে। NCRB 2022 অনুযায়ী মহিলাদের বিরুদ্ধে মোট নথিভুক্ত অপরাধে বাংলা তৃতীয় স্থানে।
এবং তারপর এলো RG Kar.
২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে একজন ট্রেনি চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের শিকার হলেন। সারা দেশ থমকে গেল। কিন্তু যা আরও স্তম্ভিত করল, তা হলো হাসপাতালের প্রমাণ বিনষ্টের অভিযোগ, তদন্তে গড়িমসি, এবং রাজ্য প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।
Sandeshkhali ভুললে চলবে না—যেখানে মহিলাদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল শাসকদলের স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে।
প্রশ্ন: Kanyashree পুরস্কার দেয় UN—আর NCRB পুরস্কার দেয় অন্যভাবে। দুটো একসাথে কীভাবে সত্যি হয়?
---
৪. দুর্নীতি: "সোনার বাংলা"—সোনা কার কাছে?
TMC-র আখ্যান: উন্নয়নের জন্য কিছু "ছোটখাটো" সমস্যা থাকে।
বাস্তবতা:
এটি কোনো isolated ঘটনার তালিকা নয়, এটি একটি প্যাটার্ন:
- Narada Sting (2016): গোপন ক্যামেরায় TMC-র একাধিক সাংসদ ও মন্ত্রীকে ঘুষ নিতে দেখা গেল
- Saradha Chit Fund: লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের সর্বনাশ, রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ
- Coal Scam: CBI তদন্ত, "কয়লা কাণ্ড"-এ দলের শীর্ষ নেতার নাম
- Cattle Smuggling: TMC-র জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল CBI-র হাতে গ্রেফতার
- SSC Scam: শিক্ষামন্ত্রী গ্রেফতার, ৫০ কোটি নগদ উদ্ধার
- Ration Scam: COVID-কালীন রেশন চুরির অভিযোগ
- পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি: একাধিক শহরে তদন্ত চলছে
এটা "বিরোধীদের ষড়যন্ত্র" নয়—এটা CBI, ED, হাইকোর্ট, এবং সুপ্রিম কোর্টের তদন্তের ফলাফল।
প্রশ্ন: দুর্নীতির অভিযোগ যখন দলের মধ্যে এতটাই ব্যাপক যে আদালতকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে—তখন সেটাকে কি "বিচ্ছিন্ন ঘটনা" বলা যায়, নাকি সেটা একটি system?
---
৫. শিক্ষা: "শিক্ষিত বাংলা"-র পরীক্ষাপত্র
TMC-র আখ্যান: স্কুলে ছাত্র বাড়ছে, সাক্ষরতা বাড়ছে।
বাস্তবতা:
ASER (Annual Status of Education Report)-এর তথ্য বারবার দেখিয়েছে যে বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণমান উদ্বেগজনক। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শিখছে কতটুকু?
কিন্তু আসল ক্ষতটা হলো SSC কেলেঙ্কারি—যা শুধু নিয়োগ দুর্নীতি নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ঘটনা। যে শিক্ষক নিজে যোগ্যতার বদলে ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছেন, তিনি ছাত্রদের কী শেখাবেন? মেধার মূল্য, না বাজারদর?
প্রশ্ন: রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠের বাড়িতে যে টাকা পাওয়া গেছে, সেটা কি "শিক্ষা তহবিল" ছিল?
---
৬. স্বাস্থ্য: "স্বাস্থ্যসাথী"-র ছায়ায়
TMC-র আখ্যান: Swasthya Sathi কার্ড লক্ষ লক্ষ পরিবারকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
বাস্তবতা:
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ভালো—কিন্তু রূপায়ণের বাস্তবতা ভিন্ন। রাজ্যের সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো, ডাক্তার-রোগী অনুপাত, এবং পরিষেবার মান নিয়ে প্রশ্ন বারবার উঠেছে।
RG Kar আবার এখানেও। এটি শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়—এটি দেখিয়ে দিয়েছে রাজ্যের সরকারি মেডিক্যাল কলেজের প্রশাসনিক অন্ধকার, হাসপাতালে ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
জুনিয়র ডাক্তাররা রাস্তায় নামলেন। দেশজুড়ে মোমবাতি জ্বলল। রাজ্য সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল—অপেক্ষা এবং নীরবতা।
প্রশ্ন: বীমার কার্ড দেওয়া আর হাসপাতালে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা—এই দুটোর মধ্যে কোনটা কঠিন কাজ?
---
Logical Fallacy-র সংক্ষিপ্ত ক্যাটালগ
তৃণমূলপন্থী আখ্যানে যে কৌশলগুলো বারবার দেখা যায়:
১. Cherry-picking: Kanyashree-র পুরস্কার তুলে ধরো, NCRB-র তথ্য চাপা দাও।
২. False Comparison: "বামেরা ৩৪ বছরে কী করেছিল?"—এই প্রশ্নটি ১৩ বছরের দায় এড়ানোর সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি। বাম আমলের ব্যর্থতা TMC-র দুর্নীতির লাইসেন্স নয়।
৩. Input vs Outcome Confusion: "এত টাকা খরচ করা হয়েছে" মানেই "কাজ হয়েছে" নয়। প্রশ্ন হলো, টাকাটা গেল কোথায়?
৪. Whataboutery: "BJP-ও তো..." এই যুক্তি দিয়ে নিজের দায় কমানো যায় না। অন্যের অন্যায় আপনার অন্যায়কে ন্যায্য করে না।
---
"তাহলে বিকল্প কী?"
এটা TMC সমর্থকদের শেষ অস্ত্র: "তুমি সমালোচনা করছ, বিকল্প দাও।"
এই প্রশ্নটি যুক্তিশাস্ত্রে "burden shift fallacy" নামে পরিচিত। একজন রোগীর রোগ নির্ণয় করতে পারা চিকিৎসকের কাজ। "ওষুধ জানো না, তাহলে সমালোচনা করার অধিকার নেই"— এই যুক্তিতে ডাক্তারিশাস্ত্র চললে সব রোগী মারা যেত।
বিকল্প খোঁজার দায়িত্ব নাগরিকের নয়, ক্ষমতায় থাকা দলের।
১৪ বছর ক্ষমতায় থেকে যদি ঋণ বেড়েছে, বেকারত্ব রয়েছে, দুর্নীতিতে আদালত রায় দিয়েছে, নারী নির্যাতনে রাজ্য উপরের তালিকায়— তাহলে প্রশ্নটা বিকল্পের নয়।
প্রশ্নটা জবাবদিহিতার।
এবং সেই জবাবটা "বিজেপিও খারাপ..." দিয়ে শেষ করা যায় না। কারণ আপনি বিজেপির হয়ে ভোট চাইছেন না— আপনি নিজের হয়ে। নিজের হিসাব নিজেকেই দিতে হয়।
বাবু, আমি অতিব মূর্খ; ঘাসফুলের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পেলে কৃতার্থ হতাম।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।