নিজেকে চেনার ভার: সৈয়দা শাহীন নূরের এই প্রবন্ধটি পড়ে যা মনে হলো
প্রথম কথা: একটা প্রবন্ধ যা নিজেই একটা প্রশ্ন
সৈয়দা শাহীন নূরের এই লেখাটা পড়ে প্রথমে যা মনে হয় সেটা হল, এটা আসলে একটা "About Me" পেজ নয়। এটা একটা স্বীকারোক্তি। এবং স্বীকারোক্তির মধ্যে সবচেয়ে সৎ ধরনটা হলো সেটা, যেখানে লেখক নিজেও জানেন না শেষ পর্যন্ত তিনি কী স্বীকার করতে চলেছেন।
শাহীন লিখছেন, "I do not know how to introduce myself without lying." এই বাক্যটা দিয়ে তিনি একটা চুক্তি করছেন পাঠকের সাথে: আমি তোমাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলব না, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যও বলতে পারব না, কারণ সত্যটা আমার নিজের কাছেও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এটা সৎ। এবং এই সততাটাই এই লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং একই সাথে (এবং এখানে আমি সরাসরি বলব) এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।
আমি এই লেখাটা নিয়ে কথা বলতে চাই। তারিফ করতে নয়। বিশ্লেষণ করতে। এবং কিছু জায়গায় সরাসরি দ্বিমত পোষণ করতে।
---
"পরিচয়" এবং মিথ্যার প্রশ্ন
শাহীন বলছেন প্রতিটি পরিচয়দান একটা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত। এটা সত্যি। কিন্তু এটা কি সমস্যা?
এখানে একটা বিষয় ভাবতে হবে। মানুষের কোনো অবিকৃত, খাঁটি, অসম্পাদিত পরিচয় আদৌ কি আছে? না। পরিচয় মানেই বাছাই। পরিচয় মানেই কোনটা সামনে আনব, কোনটা পেছনে রাখব এই সিদ্ধান্ত। এটাকে "মিথ্যা" বলা খুব কঠোর শব্দ। বরং এটা বলা যায় — পরিচয় মানে অনুবাদ। এবং প্রতিটি অনুবাদেই কিছু হারায়, কিছু যোগ হয়।
শাহীন যখন বলছেন "You're not meeting me. You're meeting a carefully arranged series of introductions" — তখন তিনি আসলে এমন একটা দাবি করছেন যা নিজেই বিপজ্জনক। কারণ এই দাবিটার মধ্যে একটা অনুমান আছে যে একটা "আসল শাহীন" আছেন, যাকে কেউ কখনো দেখতে পাচ্ছে না, যিনি ওই সম্পাদনার আড়ালে লুকিয়ে আছেন। কিন্তু সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই জানেন (Erving Goffman থেকে Judith Butler পর্যন্ত সবাই বলেছেন) কোনো "backstage self" নেই যেটা মঞ্চের বাইরে আমাদের আসল রূপ। আমরা সবাই সবসময় পারফর্ম করছি। এমনকি যখন একা থাকি তখনও।
তাহলে প্রশ্নটা "আসল পরিচয় কী" নয়। প্রশ্নটা হওয়া উচিত, কোন পারফরম্যান্সগুলো আমার নিজের কাছে অর্থবহ মনে হয়, আর কোনগুলো চাপিয়ে দেওয়া?
এখানেই শাহীনের লেখার আসল গভীরতা। এবং এখানেই তিনি ঠিক প্রশ্নটার কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ সরে যান।
---
পেশাওয়ার থেকে টরন্টো: দূরত্ব মাপা হয় খালি করা ঘরে
শাহীনের এই রূপকটা - দূরত্ব মাপা হয় মাইলে নয়, যতটা ঘর তুমি খালি করেছ তার সংখ্যায়, এটা অসাধারণ। এটা একটা এমন সত্য যা কেউ এভাবে বলে না। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের জন্য, যারা পাকিস্তান বা বাংলাদেশ বা ভারত থেকে পশ্চিমে গেছেন, এই অভিজ্ঞতাটা চেনা।
কিন্তু এই রূপকটার মধ্যে একটা লুকানো সমস্যা আছে।
ঘর খালি করা কি সবসময় ক্ষতি? শাহীন বলছেন এই রূপান্তরকে তিনি আর "পরিত্যাগ" হিসেবে দেখেন না। কিন্তু তারপরেই তিনি একটু মনোকষ্টের সুরে বলছেন, রিয়াদের সত্তাকে তিনি মিস করেন না, কিন্তু মেনে নিয়েছেন। সিঙ্গাপুরের সত্তাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে ভাবেন। পেশাওয়ারের সত্তা এখনো সেখানে আছে।
এই ভাষাটা খেয়াল করুন। "মিস করেন না, কিন্তু মেনে নিয়েছেন।" এটা খুব সূক্ষ্মভাবে বলা একটা দুঃখের কথা। রিয়াদের সত্তাটার প্রতি তার কোনো উষ্ণতা নেই, সম্ভবত সেখানে যে জীবন ছিল তা তার জন্য কষ্টের ছিল। কিন্তু তিনি সেটা বলতে চান না, বা বলতে পারছেন না। "মেনে নেওয়া" শব্দটা এখানে একটা দরজা বন্ধ করে দেওয়ার মতো।
একজন প্রাবন্ধিক হিসেবে এই জায়গাগুলোতে শাহীন সবচেয়ে বেশি পিছু হটেন। যেখানে সত্যটা সবচেয়ে কঠিন, সেখানে তিনি একটা কাব্যিক বাক্য দিয়ে পর্দা টানেন।
এটা সমালোচনা নয়। এটা একটা পর্যবেক্ষণ। এবং এটা মানবিক। আমরা সবাই কমবেশি এটা করি।
Ph.D. এবং অ্যাক্টিভিজমের মধ্যকার উত্তেজনা
শাহীন বলছেন তার পিএইচডি এবং তার অ্যাক্টিভিজম এই দুটো আলাদা জিনিস নয়। "My understanding of the theory doesn't end where slogans begin."
এটা একটা চমকদার দাবি। কিন্তু আমি এখানে একটু দ্বিমত পোষণ করব।
বাস্তবে একাডেমিয়া এবং অ্যাক্টিভিজমের মধ্যে একটা সত্যিকারের উত্তেজনা আছে। এবং এই উত্তেজনাটাকে অস্বীকার করলে দুটো জিনিসের কোনোটারই ক্ষতি হয় না বরং সত্যিকারের বিশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত হয়।
একাডেমিয়া আমাদের শেখায় জটিলতাকে সম্মান করতে, nuance ধরে রাখতে, সহজ উত্তর থেকে সতর্ক থাকতে। অ্যাক্টিভিজমের মাঝে মাঝে দরকার হয় সহজ বার্তা, স্পষ্ট শত্রু, এবং দ্রুত সংহতি তৈরির ক্ষমতা।
এই দুটো সবসময় একসাথে চলে না।
শাহীনের একজন সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হিসেবে জানা উচিত যে মানুষের আচরণ পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল, যে "পিতৃতন্ত্র" একটি জটিল কাঠামো যার মধ্যে নারীরাও অংশীদার। কিন্তু একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে তাকে হয়তো কখনো কখনো এমন ভাষায় কথা বলতে হয় যা এই সূক্ষ্মতাকে পাশ কাটায়।
এই দ্বন্দ্বটা তিনি কখনওই স্বীকার করেন না। এবং এটাই এই প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় ফাঁক।
নিউ ইয়র্কে গায়ে জামা না থাকা: এই দৃশ্যটার কথা
শাহীন লিখছেন - তিনি আগস্টে নিউ ইয়র্কে শার্ট ছাড়া হেঁটেছেন, অপরিচিত মানুষ অশ্লীলতা এবং ধর্মীয় বাক্য চিৎকার করেছে, এবং পুরো অভিজ্ঞতাটা ছিল "somewhere between exhilarating and exhausting।"
এই মুহূর্তটা এই লেখার সবচেয়ে সরাসরি মুহূর্ত। এবং তারপরেই তিনি বলছেন এই কাজটা তাকে ঝামেলায় ফেলে।
এখানে একটা প্রশ্ন আসে — কার সাথে ঝামেলা? পশ্চিমা সমাজের সাথে? না। পাকিস্তানি সমাজের সাথে? হয়তো। কিন্তু আরেকটা সম্ভাবনা আছে — ফেমিনিস্ট আন্দোলনের ভেতরের কোনো গোষ্ঠীর সাথে।
শাহীন বলছেন, "regardless of the state, the religion, the family who loves us, or the movement that seeks to liberate us but writes a new set of rules, we can and should choose how to live them."
এই বাক্যটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন মুক্তির আন্দোলনও নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারে। এটা একটা সাহসী কথা। কারণ এটা স্বীকার করে যে ফেমিনিজমের মধ্যেও কর্তৃত্বের রাজনীতি আছে। কিন্তু তিনি এই চিন্তাটাকে পরিপূর্ণভাবে সামনে নিয়ে আসেন না।
"That last part tends to get me in trouble" — এই বাক্যটা দিয়ে তিনি বিষয়টা শেষ করে দেন।
কিন্তু ঠিক এখানেই আমি চাইতাম তিনি থামুন। এই ঝামেলাটা কী? কার সাথে? কীভাবে? ফেমিনিস্ট কমিউনিটির ভেতরে কি তার বডি অটোনমির ধারণা বিতর্কিত? কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে শাহীন একটা রহস্যময়তা তৈরি করছেন যা হয়তো কাব্যিকভাবে কার্যকর, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসম্পূর্ণ।
---
লজ্জার স্থাপত্য: এই রূপকটা কোথায় ভাঙে
শাহীন লিখছেন তিনি লজ্জাকে স্থাপত্যিকভাবে ভাবেন। একটা লোড-বেয়ারিং দেওয়াল, যেটা ভাঙার আগে বুঝতে হবে এটা কী ধরে আছে।
এটা একটা অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। এবং এটা সত্যি।
কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। লজ্জা কি সবসময় পিতৃতন্ত্রের হাতিয়ার? নাকি লজ্জার কিছু কার্যকরী দিকও আছে?
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বলে লজ্জা একটা সামাজিক আবেগ যা গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখে। নৃবিজ্ঞান বলে লজ্জার ধারণাটা সংস্কৃতিভেদে আলাদা, কিন্তু সম্পূর্ণ লজ্জামুক্ত সমাজের কোনো উদাহরণ নেই। এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও, যেখানে যৌনতা নিয়ে অনেক বেশি উদারতা আছে, লজ্জার ধারণাটা শুধু সরে গেছে অন্য বিষয়ে, যেমন পরিবেশ নষ্ট করা বা অতিরিক্ত খাওয়া।
লজ্জা কখনো যায় না। লজ্জা শুধু বিষয় বদলায়।
এই কথাটা শাহীন বলেন না। কারণ হয়তো এটা তার অ্যাক্টিভিস্ট ন্যারেটিভের সাথে খাপ খায় না। কিন্তু একজন সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি এটা জানেন।
এবং ঠিক এখানেই লেখক শাহীন এবং অ্যাক্টিভিস্ট শাহীনের মধ্যে দ্বন্দ্বটা সবচেয়ে স্পষ্ট।
---
"Feminism that ignores rent is tourism" — এই লাইনটার কথা
এই বাক্যটা এই পুরো প্রবন্ধের সবচেয়ে ভালো বাক্য।
শুধু এর জন্যই এই লেখাটা পড়া দরকার।
ক্লাস এবং ফেমিনিজমের সম্পর্কটা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে যে "ফেমিনিস্ট" আলোচনাগুলো হয়, সেগুলোর অনেকটাই মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের সমস্যাকেন্দ্রিক। গার্মেন্টস কর্মীর কথা আসে শুধু পরিসংখ্যানে। গৃহকর্মীর কথা আসে না। দিনমজুর নারীর যৌন নিরাপত্তার কথা আসে না।
শাহীন যখন বলছেন "ভাড়া-উপেক্ষী ফেমিনিজম একটা পর্যটন" এটা একটা তীব্র সমালোচনা। সেই ফেমিনিজমের, যেটা নিউ ইয়র্কে মার্চ করে কিন্তু পাকিস্তানের গেঁয়ো মেয়েটার কথা জানে না। সেই ফেমিনিজমের, যেটা টরন্টোতে বসে পাকিস্তানের নারী অধিকার নিয়ে প্যানেল ডিসকাশন করে কিন্তু সেখানে থাকা নারীদের মাটির কাছের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু (এবং এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু) শাহীন নিজেও কি এই সমালোচনা থেকে মুক্ত?
টরন্টোতে থেকে পেশাওয়ারের মেয়েদের অধিকার নিয়ে লেখা — এটাও কি একটু পর্যটন নয়? এই প্রশ্নটা আমি রেখে যাচ্ছি। উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব শাহীনের, আমার নয়।
---
চাওয়ার এবং শেখানো চাওয়ার পার্থক্য: এই প্রশ্নটা কেন অসম্ভব
শাহীন বলছেন — "the impossible task of telling the difference between what you really want and what you were conditioned into wanting।"
এটা প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। এবং এটা সত্যিই অসম্ভব। কারণ আমাদের চাওয়া এবং আমাদের কন্ডিশনিং এতটাই জড়িয়ে আছে যে আলাদা করার কোনো নিরপেক্ষ জায়গা নেই।
ধরুন, একজন মেয়ে চায় বিয়ে করতে এবং বাড়িতে থেকে সন্তান মানুষ করতে। ফেমিনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি কী বলবে? দুটো সম্ভাব্য উত্তর —
এক: "এটা তোমার কন্ডিশনিং। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তোমাকে এটাই চাইতে শিখিয়েছে। তোমার আসল ইচ্ছা এটা নয়।"
দুই: "তুমি যা চাও সেটাই তোমার চাওয়া। তোমার পছন্দকে সম্মান করো।"
এই দুটো উত্তরের মধ্যে যে উত্তরটা বেছে নেওয়া হয় সেটা নির্ভর করে একটা পূর্বধারণার উপর।নারীর "আসল" ইচ্ছা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে।
এবং এখানেই ফেমিনিজমের একটা গভীর দার্শনিক সমস্যা আছে। যদি বলি "কন্ডিশনড ইচ্ছা আসল ইচ্ছা নয়" তাহলে কার কাছে সেই "আসল ইচ্ছা"র সংজ্ঞা? যদি বলি "তোমার যেকোনো পছন্দই বৈধ" তাহলে নিপীড়নমূলক কাঠামোর সমালোচনাই বা কীভাবে করব?
শাহীন এই প্রশ্নটা তুলছেন। কিন্তু উত্তর খুঁজছেন না। তিনি বলছেন "কেউ যদি সহজ উত্তর দেয় সে তোমাকে কিছু বেচতে চাইছে।"
এটা সত্যি। কিন্তু এই বলাটাও একটা কৌশল। সহজ উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাতে কঠিন উত্তরের কাজও না করা।
শাহীন, পিএইচডি করা সামাজিক মনোবিজ্ঞানী, এই প্রশ্নটার সাথে আরো বেশি সময় কাটাতে পারতেন। না হলে এই "impossibility" একটা মরালিস্টিক ব্যাজ হয়ে যায়। আমি এত জটিল জিনিস নিয়ে ভাবি, সহজ উত্তর আমার কাছে নেই, ঠিক আছে, কিন্তু এই জটিলতার মধ্যে থেকে কোনো আলো দেখানোর চেষ্টাও নেই।
---
আম্মু এবং যা বলা হয়নি
"Ammu, that's the name — there. It emerged on its own accord, from the depths of memory, as it were."
এই একটা বাক্য পুরো প্রবন্ধের সবচেয়ে বেশি ভার বহন করছে।
শাহীন তার মাকে নিয়ে কথা বলতে চান। কিন্তু পারছেন না। তিনি বলছেন মায়ের প্রভাব তার ভাষায়, তার রূপকে, তার নীতি আলোচনার আড়ালে থাকা আসল অনুভূতিতে। তিনি বলছেন মায়ের সম্পর্কটা জটিল এবং "That's as far as I can go right now।"
এটা একটা লেখকের সবচেয়ে সৎ মুহূর্ত। এবং সবচেয়ে বেদনাদায়ক।
কারণ মা এবং মেয়ের সম্পর্কে, বিশেষত দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে, একটা অসম্ভব জটিলতা আছে। মা হলেন একই সাথে শিশুর প্রথম আশ্রয় এবং সমাজের প্রথম প্রতিনিধি। মা ভালোবাসেন এবং নিয়ম শেখান। মা সুরক্ষা দেন এবং সীমাবদ্ধতা তৈরি করেন। পিতৃতন্ত্র যদি একটা কাঠামো হয়, তাহলে মা সেই কাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মুখ।
এটা নিয়ে কথা বলা কঠিন কারণ মাকে ভালোবাসা এবং মায়ের সীমাবদ্ধতা সমালোচনা করা - এই দুটো একসাথে ধরে রাখা প্রায় অসহনীয়।
শাহীন এই দায়িত্বটা নেননি। তিনি "Ammu" কথাটা ফেলে রেখে সরে গেছেন।
এবং পাঠক হিসেবে আমি এই জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি আটকে গেলাম। কারণ এই না-বলা কথাগুলোই হয়তো শাহীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা।
---
পাকিস্তানি-কানাডিয়ান: দুই পরিচয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে
"I am Pakistani Canadian. I do not quite belong to either category, in the ways that either wishes."
এই বাক্যটা দেখতে সহজ। কিন্তু এর ভার অসাধারণ।
পাকিস্তান চায় শাহীন একজন "ভালো পাকিস্তানি মেয়ে" হোক। ধর্মীয়, পারিবারিক, শালীন। শাহীন সেটা নন। কানাডা চায় তিনি একজন "সফল অভিবাসী" হোক। একীভূত, উৎপাদনশীল, পশ্চিমা মূল্যবোধে বিশ্বাসী। শাহীন সেটাও পুরোপুরি নন।
এই মাঝখানের জায়গাটা। এটাই ডায়াস্পোরা অভিজ্ঞতার সবচেয়ে সততার জায়গা।
কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন — এই "মাঝখানে থাকা" কি একটা অবস্থান? নাকি এটাও একটা পরিচয়? কারণ "আমি কোনো বিভাগে পড়ি না" — এই কথাটাও একটা বিভাগ। তৃতীয় সংস্কৃতির মানুষ, ডায়াস্পোরা পরিচয় - এগুলো এখন খুব স্পষ্ট এবং অধ্যয়নযোগ্য পরিচয়।
শাহীন হয়তো এতে স্বস্তি পান না। হয়তো "আমি ব্যাখ্যাতীত" এই অনুভূতিটা বজায় রাখা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটাও বোধগম্য। কিন্তু এটা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে একটু সুবিধাজনক।
---
টরন্টোর রান্নাঘরে বসে নীরবতার কথা
প্রবন্ধের সবচেয়ে কোমল মুহূর্ত —
"She is also a person who sometimes sits at her kitchen table at times that are not specified and wonders what to do about the silence."
এই বাক্যটা পড়ে থামতে হয়।
কারণ এখানে শাহীন সত্যিই নিজেকে দেখাচ্ছেন। Ph.D. নয়, অ্যাক্টিভিস্ট নয়, পাকিস্তানি-কানাডিয়ান নয়। শুধু একটা মানুষ, টরন্টোর শীতের রাতে, রান্নাঘরের টেবিলে বসে, নীরবতা নিয়ে কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
এই নীরবতাটা কীসের? একাকীত্বের? অর্থহীনতার? নাকি এত বছর এত শহরে এত পরিচয় বহন করার পর একটা অবসাদের?
শাহীন বলেন না। এবং এই না-বলাটা এখানে সঠিক।
কারণ এই নীরবতাটা সম্ভবত ভাষায় আসে না। এবং এটাই এই প্রবন্ধের সবচেয়ে সৎ স্বীকারোক্তি। এমন কিছু জিনিস আছে যা তত্ত্ব দিয়ে বোঝা যায় না, প্রতিবাদ দিয়ে সমাধান হয় না, পরিচয়ের ভাষায় ধরা যায় না।
---
সততার প্রতিশ্রুতি: এবং এর সীমাবদ্ধতা
শাহীন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সত্যি বলার। "Performance art"-এর মতো ভঙুর সাহস নয়, আসল সত্য।
এটা সুন্দর। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিটা নিজেই একটু পারফরম্যান্সের মতো।
কারণ দেখুন, এই পুরো প্রবন্ধে শাহীন কতবার একটা কঠিন সত্যের কাছে পৌঁছে থমকে গেছেন।
মায়ের সাথে সম্পর্ক — "That's as far as I can go right now।"
ঝামেলার প্রকৃতি — "That last part tends to get me in trouble।"
রিয়াধের অভিজ্ঞতা — "I don't really miss her, but I accept her।"
প্রতিটি জায়গায় একটা দরজা খোলা হচ্ছে এবং বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এটা সৎ লেখকের স্বাভাবিক সীমা। সব সত্য একসাথে বলা যায় না, সব সত্য এখনো নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।
কিন্তু যখন কেউ "সত্য বলার প্রতিশ্রুতি" দেন, তখন এই দরজা বন্ধ করার প্যাটার্নটা একটু বেশি চোখে পড়ে।
এটা সমালোচনা না। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। শাহীন যদি সত্যিই এই প্রতিশ্রুতি রাখতে চান, তাহলে পরের লেখাগুলোতে এই বন্ধ দরজাগুলো একটু একটু খুলতে হবে।
---
ফেমিনিজম কেন একই জায়গা থেকে শুরু করে বারবার
শাহীন একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করছেন। ফেমিনিস্ট আলোচনা কেন পনেরো বছর পরেও একই জায়গা থেকে শুরু হয়?
এর উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট মনে হয়।
কারণ প্রতিটি প্রজন্মের মেয়েরা নতুন করে আবিষ্কার করে যে শরীর তাদের নিজের নয়। নতুন করে রাগ করে। নতুন করে লড়াই করে।
এই লড়াইয়ের ইতিহাস হস্তান্তর না হলে প্রতিটি প্রজন্মকে চাকা আবার আবিষ্কার করতে হয়।
কিন্তু আরেকটা কারণ আছে যা শাহীন বলেন না।
ফেমিনিস্ট আন্দোলনের একটা অংশ এই পুনরাবৃত্তিতে বিনিয়োগ করে। প্রতিটি নতুন "জেগে ওঠা" মানুষ মানে নতুন পাঠক, নতুন অনুসরণকারী, নতুন ক্লায়েন্ট। পুরানো লড়াইয়ের ইতিহাস শেখানোর চেয়ে নতুন করে রাগিয়ে তোলাটা বেশি লাভজনক, ইদানীং কালের মনোযোগের অর্থনীতিতে।
এটা একটা অস্বস্তিকর সত্য। কিন্তু এটা সত্য।
---
শেষ কথা: এই লেখাটা কী এবং কী নয়
শাহীনের এই প্রবন্ধটা একটা অসামান্য শুরু।
এটা একটা সৎ মানুষের অসম্পূর্ণ আত্মপরিচয়। এতে বুদ্ধিমত্তা আছে, কাব্যিকতা আছে, সাহস আছে, এবং একই সাথে কৌশলগত পশ্চাৎপদতা আছে, বন্ধ দরজা আছে, অনুমানকৃত জটিলতার ভাষা আছে যা কখনো কখনো গভীর বিশ্লেষণের জায়গা নেয়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা কী জানেন? এই লেখাটা একটা প্রশ্ন। উত্তর নয়।
এবং প্রশ্ন তোলার মধ্যে একটা সাহস আছে।
শাহীন বলছেন — "Maybe all I have to offer is this: a living argument, still in progress।"
এটা যথেষ্ট। একটা জীবন্ত যুক্তি, যা এখনো সম্পন্ন হয়নি (হয়তো কখনো হবেও না) এটাই সবচেয়ে সৎ লেখার উপাদান।
আমার শুধু একটাই অনুরোধ। পরের বার যখন সেই বন্ধ দরজাগুলোর সামনে দাঁড়াবেন, আম্মু নিয়ে, রিয়াদ নিয়ে, ঝামেলার প্রকৃতি নিয়ে, আর অনেকদূর এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থামবেন না।
সেই দরজাগুলো খুললে সত্যিকারের লেখা শুরু হবে।
এবং তখন পাঠক শুধু "আপনাকে ফলো করার" সিদ্ধান্ত নেবে না, তারা নিজেদের ভেতরে কিছু একটা খুঁজে পাবে।
---
[এই লেখাটি সৈয়দা শাহীন নূরের প্রবন্ধের প্রতি একটি সরাসরি ও সৎ সাড়া। সমালোচনা শ্রদ্ধা থেকেই আসে। এবং শ্রদ্ধা মানে সম্মতি নয়।]