এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • "রক্তবীজ"— আসলে কীসের বীজ?

    Aniruddha Garai লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ নভেম্বর ২০২৩ | ৩৪৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • রবিবারের দুপুরে চিকেন প্যাঁদানো মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালি প্রায়ই গুরুপাক হজমকারী জোয়ান মৌরী চিবুতে চিবুতে বলেন, "আট্টা, মুঠলমান ‌মানেই কি টেরোরিস্ট, বলো দি'নি?" টলিউডের শিবু নন্দিতা আবার বাঙালিদের নানাবিধ সেন্টিমেন্ট নিজেদের রাডারে ধরতে পারেন ভালো, তারপর সেইসব নিয়ে বস্তাপচা গল্পও ফাঁদতে পারেন। যেমন বাড়ির বউ কম্প্রোমাইজ করতে পারেনি বলে তার বর আজ অন্য কাউকে নিয়ে সুখী, যেমন বৃদ্ধ বরের মুতের ঘ্রাণ ফেরোমেনের সমান এবং তার ফেলে দেওয়া মাছের ছাল খাওয়া মানেই ভালোবাসা ইত্যাদি। এবারে তারা একটি সত্য ঘটনাকে শিখণ্ডী করে বাঙালি হিন্দুদের চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক সেন্টিমেন্টে ঘি ঢালতে নেমে পড়েছেন। কাশ্মীর ফাইলস এবং কেরালা স্টোরির দেখানো পথ ধরে তারা নিয়ে এসেছেন "রক্তবীজ"। ছবিতে খুব স্পষ্ট করে দুটো পক্ষ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক, স্বেতবস্ত্র ভূষিত, মিষ্টভাষী, শান্ত, স্নিগ্ধ, ধার্মিক বর্ণহিন্দুরা, যারা কিনা দেবীপক্ষ; আর অসুরপক্ষ হল গতর খাটা কিছু মানুষ, যারা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে (?!) মুসলমান, এবং সবাই টেরোরিস্ট। এরা সবাই সারাক্ষণ ব্রেনোয়াসড পুতুলের মত, "মাইনসের চেয়ে মকসত্ বড়" বিড়বিড় করে আর দেশের ভেতর বোমা চালান করে। দুজন বাদে ছবির প্রত্যেক মুসলমান চরিত্রই আতঙ্কবাদী। 'রক্তবীজ' এরাই, এবং শিবু নন্দিতার বক্তব্য, এরা বাংলার ঘরে ঘরে আছে। ছবির শেষে সব 'দুসমন'-দের খতম করে দেওয়ার পরেও দেখানো হয় এরা রক্তবীজের মতোই আবার বেঁচে উঠছে। ছবিতে অনিমেষের দিদি যখন বলেন, "ক্ষমাই পরম ধর্ম", তখন অনিমেষ, অর্থাৎ ভিক্টর জবাব দেন যে এই সময়টা ক্ষমা নয়, যুদ্ধের সময়। অর্থাৎ, গোটা ছবিটা আসলে একটা চেতাবনি। একটি সম্প্রদায়ের মানুষকে আতঙ্কবাদী ‌বলে দাগিয়ে দেওয়া, একটি ভাষাকে আতঙ্কবাদীদের ভাষা বলে দাগিয়ে দেওয়া, ফ্যাসিবাদের এই রাজনীতিরই শরিক এই ছবি। আর সেই ছবি আমরা দিব্যি বাড়ির দাদু ঠাকুমা নাতি পুতি নিয়ে একসাথে উৎসবের আমেজে মুখে পপকর্ন ফেলতে ফেলতে দেখে ফেলছি। ছবির শেষে দর্শকদের মধ্যে থেকে শোনা যাচ্ছে– "আরো ধর্ম আছে, এদের ধর্মেই এরকম কেন হয় বলো তো ?" মানুষ চারদিনের উৎসবে মেতেছে, এবং সেই উৎসবের সিরিঞ্জ দিয়েই কী সুন্দর ঘৃণার ওষুধ ঢুকে যাচ্ছে তার মগজে। এ হল সূক্ষ্মভাবে উৎসবেরও রাজনীতিকরণ। ফ্যাসিবাদ যখন বিষের মত একটা জাতির শিরা উপশিরায় ঢুকে যেতে চায়, তখন এভাবেই তারা পপুলার কালচারের মধ্য দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে। আমাদের ডালভাত আলুভাতের মত পরিচিত শিল্পীরা, যেমন শিবু নন্দিতা, আবির, মিমি, ভিক্টর— এরা সবাই সচেতনভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। কেউ সরাসরি বিষ ছড়াতে, কেউ সেই পানি না ছুঁয়ে মাছ ধরতে। যেহেতু ওরা আমাদের 'ঘরের লোক' তাই আমরা বুঝিও না ঘোড়ার আন্ডা আসলে প্রোপাগান্ডা। হিন্দুত্ববাদী দল যখন পাওয়ারে, তখন মেনস্ট্রিম গৌরী সেনরাও এসব ছবির পেছনে টাকা ঢালেন, কারণ ব্যওসা।

    শিল্পীদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। প্রশ্ন তুলুন, এত ঘটনা থাকতে এই ঘটনাই বেছে নেওয়া হল কেন ছবির জন্যে, এবং নেওয়া হলেও সেটা এরকম ভাবে কেন বানানো হল যা মানুষের মনে সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দেবে– এমন একটা সময়ে যখন দেশের মুসলমানরা আকছার লিঞ্চিংয়ের শিকার হচ্ছেন, সাউথ কলকাতার মত জায়গায় ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য ঘর পাচ্ছেন না, হিন্দুপ্রধান এলাকায় থাকতে মোটে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না? দাঙ্গার নামে মুসলমানদের পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হচ্ছে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে "আজাদীর অমৃত মহোৎসব" উদযাপনে বিলকিস বানোর ধর্ষকরা সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে, এবং তাদের মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ? যেখানে একটি ক্ষমতায় থাকা দল বিশ্বের বৃহত্তম গনতন্ত্রের বুকে দাঁড়িয়ে সমানে চেষ্টা করে চলেছে তার কাঠামোটি সম্পূর্ন বদলে ফেলে সেটাকে নাৎসি জার্মানি করে তুলতে? কোন বিষয় নিয়ে শিল্পী ছবি বানাবেন, কীরকম ভাবে বানাবেন তা যদি তার শৈল্পিক অধিকার হয়, তবে দর্শক হিসেবে আপনারও অধিকার আছে স্রেফ যা খাওয়ানো হচ্ছে তা খেয়ে না নিয়ে এই প্রশ্নগুলো তোলার, ছবির মেসেজ সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করে তোলার। কনজ্যুমার বাদেও আপনি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন একজন দর্শক, যিনি ছবির টানটান চিত্রনাট্য, বাঙালি আইপিএসের কঠোর চোয়াল, গদগদ ফ্যামিলি ডাইনামিক্স, মিষ্টি দোহার— এইসবে অভিভূত হওয়ার পরেও ছবির বক্তব্য, উদ্দেশ্য নিয়ে ভাববেন। নিজেদের এই সামাজিক– রাজনৈতিক দায় এবং অধিকার থেকে এমন বাংলা ছবির পাশে না দাঁড়িয়ে, বরং ল্যাং মেরে দিন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • Aniruddha Garai | ২৫ জুন ২০২৬ ২১:০৫741380
  • ফ্যানবয় ফের ফিরিয়াছে
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন