দুহাজার সালের পর থেকে ফিদায়েনের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন আইবির নজরে আসে। ওই সময় থেকেই উমর জঙ্গি সংগঠনটিতে ইনফিলট্রেট করতে শুরু করে। একজন বিজ্ঞানী যেভাবে ভিনগ্রহে পাঠানো স্পেসশাটলের সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অবনীমোহন ঠিক সেইভাবে উমরের পাঠানো ইনফরমেশন থেকে ফিদায়েনের অবয়বটি নির্মাণ করছিলেন। ভিনগ্রহের আবহাওয়া অন্যরকম, সেখানের বায়ুমণ্ডলে তাপ ও চাপের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তাকে ঢেকে দেয়, আবার অনেকসময় সিগন্যালের পুরোটাই ভরে যায় অবান্তর নয়েজে। ফলে অসম্পূর্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। তবুও বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও অবনীমোহন একটু একটু করে ফিদায়েনের অন্তর্জগতটা দেখতে পাচ্ছিলেন। কাশ্মীরে ফিদায়েনের পক্ষে সংগঠিত আর্মির বিরুদ্ধে একটিমাত্র ফ্রন্টে বেশিদিন সংঘর্ষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হচ্ছিল। ক্রমশ জঙ্গি সংগঠনটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে উত্তর ভারতের হিন্টারল্যান্ড জুড়ে। অবনীমোহন এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রটা জানবার জন্য ছটফট করছিলেন। কিন্তু ফিদায়েনের প্রহেলিকা দুরূহ, অনেকসময় একেবারেই দুর্বোধ্য মনে হয় তাদের কার্যকলাপ। নানারকম ছোটোখাটো সেটব্যাক উমরের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়। কখনো কখনো অবনীমোহন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে হয়তো বা উমর ধরা পড়ে যাবে। একটা একটা করে বছর কাটতে থাকে। একসময় পট্টনায়েক পর্যন্ত অবনীমোহনের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেয়, যথেষ্ট হয়েছে, ওকে বের করে আনুন। রাতে, গভীর রাতে, নিজের অফিসে বসে অবনীমোহন সিগারেট টানতে টানতে ডেস্কল্যাম্পের আলোয় বারবার খুঁটিয়ে-পড়া ফিল্ড এজেন্টের নথিগুলি আবার উল্টেপাল্টে দেখেন। নানারকম সম্ভাবনার কথা মনের ভেতর নাড়াচাড়া করতে থাকেন। আরও বছর দুয়েক কেটে যায়। উমর ফিদায়েনের অক্টপাসের মত ছড়িয়ে থাকা শুঁড়গুলোর হদিশ পেতে শুরু করে। যত সে ভেতরে ঢোকে, তত যেন তার দক্ষতা বাড়তে থাকে। আর আইবির দপ্তরে বসে অবনীমোহনের চোখের সামনে একটু একটু করে গোটা প্যাটার্নটা ফুটে ওঠে। একদিন পট্টনায়েককে ডেকে পাঠান নিজের কামরায়। টেবিলে পট্টনায়েকের সামনে পাশাপাশি দুটো ম্যাপ রাখেন তিনি। বাঁদিকে, ফিদায়েনের পরিবর্ধিত যুদ্ধক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের হিন্টারল্যান্ড জুড়ে। ডানদিকে, ওই একই এলাকায় বিরানব্বইয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর থেকে যেখানে যেখানে দাঙ্গা হয়েছে। পট্টনায়েক দুটো ম্যাপের মিল দেখে ঘাড় নাড়ে। যদি আমি একটা ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের স্ট্র্যাটেজিক এডভাইসর হতাম, আমিও ঠিক এই জায়গাগুলোতেই রিক্রুটমেন্ট ইনিশিয়েটিভ নিতাম, এএম বাসু ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে চুমুক দেন।
ততদিনে উমর ফিদায়েনের ভেতরে এতটা বিশ্বাস অর্জন করেছে যে, তাকে বিহার ও ইউপির সীমান্তে মিরানপুর নামে একটা না-গ্রাম না-শহর জায়গায় সংগঠনের কাজে পাঠানো হয়। বাবরি ধ্বংসের পর থেকে উত্তর ভারতে যে অজস্র ফল্ট লাইন তৈরী হয়েছিল, মিরানপুর তার মধ্যে পড়ে। বিন্ধ্যর পাদদেশে অবস্থিত এই ছোট্ট এলাকায় কয়েকটা ফ্যাক্টরি ছাড়া কিছুই নেই। হিন্দু ও মুসলমান মহল্লার লোকেরা এই ফ্যাক্টরিগুলোতেই কাজ করে। ফলে সেগ্রেগেশনের সুযোগ জীবিকার প্রয়োজনেই কম, তার বদলে আছে কাছাকাছি থেকে পরস্পরকে সহ্য করতে না পারার তীব্র জ্বালা। উমর যখন মিরানপুরে গিয়ে পৌঁছায়, জায়গাটা বারুদের স্তুপ হয়ে আছে। মিরানপুরে জলের অভাব বারোমাসের, সব মরশুমে। মাসদেড়েক আগে সরকারের পক্ষ থেকে একটা জলের ট্যাংক বসানো হয়েছে মিরানপুরের পশ্চিমে পাহাড়ের গায়ে। মুসলমান মহল্লাগুলোয় জলের লাইন পাতা হয়ে গেছে। কিন্তু বাকি এলাকাগুলোয় কাজ কবে হবে ঠিক নেই। ফলে হিন্দু মহল্লাগুলোয় চাপানউতোর বাড়ছে। উমরের কাছে খবর আছে, এবার দাঙ্গা হলে সেটা হবে মিরানপুরের সবচেয়ে ভয়ানক দাঙ্গা। মিরানপুরের বাজারে এক পন্ডিতজীর মুদিখানার দোকানে গিয়ে উপস্থিত হয় উমর। দোকানের ওপরে এককামরার ঘর ভাড়া দেন পন্ডিতজী মিরানপুরে বাইরের লোক কেউ এলে। চানপায়খানার বন্দোবস্ত দোকানের পিছনে খোলা জায়গায়। সাধারণত মিরানপুরে বাইরের লোক কেউ আসেনা, কালেভদ্রে সরকারী কর্মচারী ছাড়া। উমরের কাগজপত্রেও লেখা আছে, সে সরকারী সার্ভের কাজে এসেছে। আসলে তাকে পাঠানো হয়েছে সুকেশ তিওয়ারি নামে একটা লোককে খুন করতে।
সুকেশ তিওয়ারির যখন বারো বছর বয়েস, তখন একদিন ভোররাতের কথা তার খুব মনে পড়ে। সেদিন জমিয়ে শীত পড়েছিল মিরানপুরে। সারারাত ধরে পাহাড়ী নেকড়ের মতো ঝুঝকো ঝুঝকো কুয়াশা গড়িয়ে নেবেছে গোটা এলাকাটায়। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, লেপ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে বারো বছরের সুকেশের। তবুও সে চটপট উঠে পড়ে। উঠোনের কোণে হিমের সর-পড়া বালতির কনকনে জলে মুখ আঁচিয়ে নেয়। তারপর মায়ের বোনা চটের মতো কারুকার্যহীন একটা সোয়েটার চাপিয়ে নেয় গায়ে। তার বাবা ততক্ষণে তাকে তাড়া লাগাচ্ছে চা খেতে খেতে। অনেকদূর যেতে হবে তাদের বাপবেটাকে অযোধ্যায় মসজিদ ভাঙতে। ওই ভোরটার কথা সুকেশের মনে পড়ে। ওই যে তার বারোবছরের মাথার ভেতরে অবোধ্য অনুভূতি, সবটা সে বুঝতে পারছে না, তবুও দূরে, ঘর ছেড়ে অনেকদূরে বাবার সঙ্গে সে যাচ্ছে ট্রেনে চড়ে দেশ দেখতে দেখতে, একটা বড় কাজে যোগ দেবার লোভে, ওই তার জীবনের প্রথম থ্রিল। তারপর তো সুকেশ দল পাকিয়ে মিরানপুরে একটার পর একটা দাঙ্গায় শিখল কিভাবে সহজে মুসলমানদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, কোথায় আগুন ধরালে এমনকি পাকা ইঁটের বাড়ি অনায়াসে ধ্বসে পড়ে। একুশ বছর বয়েসে সে নিজের হাতে একজন সমবয়সী মুসলিম তরুণকে খুন করে। যখন ছেলেটিকে সে মেরে ফেলছে একটু একটু করে, বুঝতে পারছে ছেলেটির দারুণ বেঁচে থাকবার প্রবৃত্তিকে রাবারের মত টেনে লম্বা করতে করতে পীড়নের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে সে ছিঁড়ে ফেলছে, ওই বারো বছর বয়েসের ভোরটার স্মৃতি তার ফিরে আসে। সেই ট্রেনের হুইসেল, করসেবকদের সঙ্গে অচেনা প্ল্যাটফর্মে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেওয়া, দূরে আরও দূরে কী যেন হচ্ছে, সেখানে পৌঁছানোর সেই উত্তেজনা। ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ে সুকেশ, মিরানপুর ছেড়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোয় যোগ দিতে যায়। কিন্তু কোথাও টিকতে পারে না। ততদিনে নব্বইয়ের উত্তেজনা থিতিয়ে গেছে, বাবরির ঘটনা আর পাঁচটা কোর্ট কেসের মতন বৈশিষ্ট্যহীন হয়ে পড়েছে। ইস দেশমে হিন্দুয়ো কা ইজ্জত রেন্ডি কা চুচী জ্যায়সা হ্যায়, এক সংগঠক তাকে বলে, যো আয়েগা দাবাকে চলা যায়েগা। কিন্তু সুকেশ তিওয়ারি তার কিশোর বয়সের সেই আশ্চৰ্য ভোরটাকে খুঁজে ফেরে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আলোঅন্ধকারে-চলাফেরা-করা অনেক কিসিমের লোকের সঙ্গে তার চেনাজানা হয়। গোপনে গোপনে সারা দেশ জুড়ে কাজ এগিয়ে চলেছে দেখে সুকেশ তিওয়ারি বিস্মিত হয়ে যায়। একসময় মিরানপুরে ফিরে আসে সে। পুরনো সাকরেদরা তাকে দেখে খুশি হয়। সুকেশ দলবল জুটিয়ে রাজনীতিতে নামে। কিন্তু পরপর দুবার ভোটে দাঁড়িয়ে হেরে যায় সে। দ্বিতীয়বার তো তার জামানত জব্দ হয়। এইবার সুকেশ মিরানপুরের হিন্দুদের ভেতর সলতে পাকাচ্ছে। তার মুখ দেখে বোঝা যায়না মনে মনে সে কি পরিকল্পনা আঁটছে।
সন্ধ্যের পর মিরানপুর জায়গাটা শুনশান হয়ে যায়। উমর তার ঘরে চৌকিতে শুয়ে বই পড়বার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে ইলেক্ট্রিকের অবস্থা তথৈবচ। ঘরের বাতিটা এতই মিটমিট করে জ্বলে যে তাতে বই পড়া কঠিন। তবুও উমর তার ব্যাগ হাতড়ে হলদে খবরের কাগজে মোড়া একটা বই বের করে আনে। বইটা খুলে সে প্রথম পাতাটার দিকে চেয়ে থাকে। পাতার মাথায় বড় হরফে WINGS OF FIRE লেখা, তার ঠিক নীচে খুদি খুদি হরফে ছাপা An Autobiography। তারপর অনেকখানি অংশ ফাঁকা। পাতার মাঝামাঝি ইংরেজিতে একটা সই: সরিতা বাসু, সিমলা। সরিতার কোন ফটোগ্রাফ উমরের কাছে নেই, কেবল এই বইটা রয়ে গেছে যেটা সরিতা তাকে ধার দিয়েছিল পড়তে। বইটা হাতে নিয়ে উমর চৌকিতে শুয়ে থাকে। মাঝেমাঝে এই অস্থায়ী পরিচয়ে গুপ্তচরের জীবন কাটাতে কাটাতে তার সাংঘাতিক একা লাগে আর তখন সরিতার কথা তার খুব মনে পড়ে। সে জানেনা সরিতার সাথে তার আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা। সিলিংয়ে ঝুলন্ত ফিলামেন্ট-আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে সমস্ত জীবনটা খতিয়ে দেখে। এই র্যান্ডম অক্ষাংশ-দ্রাঘিমায় শুয়ে শ্রীনগরে তার বাবার রেস্তোরাঁটা, এমনকি সিমলার বোর্ডিং স্কুল যেন মস্তিষ্কের ধোঁয়াটে বিভ্রম মনে হয়। তারপর তার মনটা ভারতবর্ষের মানচিত্র বরাবর ঘুরতে ঘুরতে আরও দূরে চলে যায় দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে, সে কল্পনার চোখে দেখতে পায় রামেশ্বরমে একটা মুসলিম ছেলে বড় হচ্ছে, তার বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম, সেই ছেলেটা ইস্কুলে বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো শিখছে, ইস্কুল থেকে বেরিয়ে ঠিক করছে পদার্থবিদ্যা নিয়ে এগোবে, কিন্তু তাকে টানছে এয়ারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, একসময় সে ভর্তি হচ্ছে মাদ্রাজের কলেজে তেমন সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও, কেননা ততদিনে তার স্বপ্নে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে যাচ্ছে অগ্নিউদ্গীরণকারী আকাশযান আর সেই ছেলেটাই চল্লিশ বছর পরে হয়ে উঠছে দেশের শ্রেষ্ঠ ক্ষেপণাস্ত্রবিদ। এরকম ঘটনা এদেশে ঘটে? তাহলে এখন সে কোথায় রয়েছে? হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে উমরের মনটা রামেশ্বরম থেকে মিরানপুরে ফিরে আসে, যেখানে নিঝুম রাত নেমে এসেছে, সে শুয়ে আছে চৌকির ওপর আর দূরে কালো পাহাড়ের গায়ে ভিনগ্রহ থেকে আসা অজানা উড়ন্ত বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে চারপেয়ে জলের ট্যাংকটা, যেন অপেক্ষা করছে আরেকটা দাঙ্গার। সমস্ত জীবনটা হঠাৎ উমরের এবসার্ড মনে হয়। এবসার্ড, এবসার্ড, সে মনে মনে মাথা নেড়ে বলে।
ক'দিন যেতেই উমর বুঝতে পারে পন্ডিতজীর ঘরে যারা তার থাকবার ব্যবস্থা করেছে, তারা খোঁজখবর নিয়েই করেছে। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত যখন বেশ গভীর হয়, নীচের তলা থেকে আসা আওয়াজে উমর টের পায় জনাকয়েক লোক এসে হাজির হয়েছে পন্ডিতজীর দোকানে। হাতের বইটা রেখে চৌকি ছেড়ে উমর উঠে দাঁড়ায়। তারপর আস্তে আস্তে কোন আওয়াজ না করে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতেই সে যে জায়গাটায় দাঁড়ায়, সেটা পন্ডিতজীর দোকানের পিছনদিক। এদিকে কলতলা রয়েছে, খাটা পায়খানা আর ড্রেন। উমর সেদিকে না গিয়ে দোকানের পিছনে আধখোলা জানলাটার কাছে সেঁটে দাঁড়ায়। দোকানের ভেতরে লোকগুলো জড়ো হয়েছে জুয়োর আড্ডায়। পন্ডিতজীর গলাও কানে আসে। উমর উঁকি মেরে দ্যাখে পন্ডিতজী দোকানের এককোণে বসে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ছেন। লোকগুলো জুয়ো খেলতে খেলতে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করতে থাকে। উমর আন্দাজ করে, এরা সুকেশ তিওয়ারির সাঙ্গোপাঙ্গ। একসময় দোকানের সামনের দিক থেকে একটা মোটরসাইকেলের আওয়াজ ভেসে আসে। সেটা দোকানের সামনে থামে। কিছুক্ষন পরে ঘরে মাঝারি উচ্চতার কিন্তু পেটানো চেহারার একজন নতুন লোক এসে ঢোকে। জুয়োর আড্ডার সদস্যরা হৈহৈ করে ওঠে। উমর বুঝতে পারে, এই লোকটাই সুকেশ তিওয়ারি। সার্ভে করার অজুহাতে দিনেরবেলা উমর মিরানপুরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায়। দিনকয়েক যেতেই উমর টের পায় তার পিছনে সুকেশ তিওয়ারির ফেউ লেগে গেছে। তাতে উমর অবাক হয়না, মিরানপুরে পন্ডিতজীর নতুন গেস্ট এসে হাজির হবে আর সুকেশ তিওয়ারি কোন কৌতূহল দেখাবে না, এটা কি হতে পারে? সুকেশ তিওয়ারির ফেউ যেন তার পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে সেইটেই উমর চায়। একদিন রাতে পন্ডিতজীর দোকানে জুয়োর আড্ডা শেষ হয়ে গেছে, এমনসময় সুকেশের এক শাকরেদ দোতলায় উঠে এসে উমরের দরজায় টোকা দেয়। উমর যেন ঘুমোচ্ছে ভান করে প্রথমে দরজা খোলেনা। তিনবার টোকা পড়তে দরজা খুললে, সুকেশের শাকরেদ জানায় তিওয়ারিজী তাকে নীচে ডাকছে। উমর লোকটির পিছন পিছন সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। দোকানের সামনে সুকেশ মোটরসাইকেলের সীটে বসেছিল। উমরের সঙ্গে সে বেশ ভাল ব্যবহার করে। তাকে জিজ্ঞেস করে সে কোথা থেকে এসেছে, মিরানপুরে কী করছে। উমর সুকেশের জানা কথাগুলোই সুকেশকে জানায়, সার্ভে ইত্যাদি। সুকেশ সহাস্যে বলে যে, উমর তাকে ঠিক কতটা গর্দভ ঠাউরেছে। তারপর হাসি থামিয়ে উমরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, আপনি কে? উমর একটুও না ঘাবড়ে সুকেশের চারপাশে দাঁড়ানো সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে চোখ বুলিয়ে একটা হাই চাপতে চাপতে বলে, সুকেশজী, আজ রাত হয়ে গেছে। কাল বিকেলে আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনি একা আসবেন। তখন কথা হবে। সুকেশ নির্নিমেষ উমরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর কি ভেবে বলে, ঠিক আছে। কাল বিকেল চারটায় রেডি থাকবেন। পরেরদিন বিকেলে সুকেশ মোটরসাইকেল চালিয়ে আসে, সঙ্গে একজন শাকরেদ। দোতলায় উমরের ঘরে উমর সুকেশের জন্য একখানা চেয়ার পেতে দেয়। নিজে চৌকিতে বসে। দরজা ভেজিয়ে সুকেশের লোকটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘলা বিকেল, ঘরের ভেতর ছায়া-ছায়া হয়ে এসেছে আরও। সুকেশ ঠোঁটে সিগারেট রেখে ফস করে দেশলাই জ্বালায়। উমর কথা শুরু করে: সুকেশজী, আমাকে যারা পাঠিয়েছে, তারা আপনাকে একটা প্রস্তাব দিতে চায়। আপনি যে যুদ্ধে নামতে চলেছেন, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই। ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠে সুকেশ, কিন্তু মুখের একটা রেখাও না কাঁপিয়ে বলে, কিভাবে সাহায্য করবেন আপনারা? উমর দেয়ালের দিকে তাকায়, আনমনে বলে, আমরা আপনার হয়ে লড়ব। ধকধক করে সুকেশের সিগারেটের আগুন জ্বলতে থাকে। মার্সিনারী? সে বলে। উমর আলতো ঘাড় হেলায়, শুধু লোক নয়, টাকা অস্ত্র দিয়ে আপনাকে সবরকমভাবে সাহায্য করতে চাই। কেন? এতে আপনাদের কি স্বার্থ? সুকেশ বাঁকা চোখে তাকায়। উমর বলে, ধরে নিন আপনার যা উদ্দেশ্য, আমাদেরও একই, শুধু স্কেলটা বড়ো। এরপর দুজনে কিছুক্ষন কথা না বলে পরস্পরকে মাপতে থাকে। ইতস্তত করে সুকেশ বলে, বিনিময়ে লেভারেজ চান এই তো? উমর চুপ করে থাকে। সে লক্ষ্য করে সুকেশের দৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। যেন বহুদূরের দৃশ্য দেখতে দেখতে সুকেশ বলে, অস্ত্র আমি পাচ্ছি অন্য জায়গা থেকে। কিন্তু আরও অস্ত্র, আরও লোক আর অনেক টাকা আমার দরকার। ফলে আপনার প্রস্তাব আমি ফেলতে পারব না। উমর কানখাড়া করে শুনতে থাকে। এটা তার কাছে নতুন ইনফরমেশন যে সুকেশের পিছনে কোন অদৃশ্য তৃতীয়পক্ষ আছে। সুকেশের কথা শেষ হলে উমর ইচ্ছে করে সময় নেয়। তারপর শান্তভাবে বলে, শুনুন সুকেশজী, আপনার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ আগ্রহ জন্মেছে।আর আমরা আপনার পক্ষে থাকলে আপনাকে হারাজেতা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, কিন্তু আমরা কোনো এমেচার থার্ড পার্টির সাথে হাত মেলাই না। ঘরের ভেতরে ততক্ষনে প্রায় পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেই ম্লান আঁধারে সুকেশ ক্রূর ভঙ্গিতে হাসে। তারপর বলে, কাল আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। আমি আসতে পারব না, তবে আমার একটা ছেলেকে পাঠিয়ে দোবো। আপনার জন্য আমি গন্তব্যস্থলে অপেক্ষা করব। উমর নির্বিকারমুখে বলে, গিয়ে কি কিছু লাভ হবে? যেন তার কথা শেষ হয়ে গেছে, এই ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়তে পড়তে সুকেশ বলে, দেখাই যাক না। আচ্ছা আসি। বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।