সোমনাথবাবু যখন উইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন, তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা। ক্যালকাটা ক্লাবের লাউঞ্জে তখন ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। সৌম্যক চশমার কাচটা মুছে উইলের খসড়ায় চোখ বোলাল। নিচে সই রয়েছে বিখ্যাত ভাস্কর ও স্থপতি কৌশিক মৈত্রের। আজ থেকে ঠিক সাতদিন আগে তিনি মারা গেছেন। নিঃসন্তান, একাকী, এবং অদ্ভুত রকমের খামখেয়ালি এই মানুষটি তাঁর জীবনের শেষ সৃষ্টি - একটি মার্বেল পাথরের মূর্তি এবং তাঁর সমস্ত সঞ্চয় নিয়ে এক জটিল বাঁধন তৈরি করে গেছেন।
উইলের বয়ানটা অদ্ভুত:
"আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, যার বাজারমূল্য প্রায় কয়েক কোটি টাকা, তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লকারে রাখা আছে। সেই লকারের চাবিটি লুকানো আছে আমার তৈরি শেষ ভাস্কর্য ‘স্থিতাবস্থা’ (The Equilibrium)-র ভেতরে। যে ব্যক্তি মূর্তিটিকে অক্ষত রেখে, কোনো রকম ভাঙচুর না করে, কেবল বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ও গণিতের সাহায্যে তার স্থায়িত্বের রহস্য এবং নিখুঁত ভরকেন্দ্র (Center of Mass) খুঁজে বের করতে পারবে, লকারের চাবিটি তারই হবে। তবে মনে রেখো - গণিত যেখানে শেষ হয়, শিল্প সেখানে খেলা শুরু করে।"
"মূর্তিটা এখন কোথায় সোমনাথদা?" সৌম্যক জিজ্ঞেস করল। সে পেশায় ফরেনসিক বায়োমেকানিক্সের কনসালট্যান্ট। মানুষের শরীরের হাড়, পেশি আর লিভার-মেকানিজমের ওপর ভর করে কীভাবে একটা শরীর ভারসাম্য বজায় রাখে, তা নিয়ে সে ল্যাবরেটরিতে দিনরাত কাটায়।
"কৌশিকবাবুর বালিগঞ্জের স্টুডিওতে।" সোমনাথবাবু একটা চুরুট ধরালেন। "সরকারি আমলারা অলরেডি মূর্তিটা দেখে গেছেন। তাঁরা ওটাকে ক্রেন দিয়ে তুলে মিউজিয়ামে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো সৌম্যক? মূর্তিটাকে মেঝে থেকে এক ইঞ্চিও নড়ানো যাচ্ছে না। অথচ ওটা কোনো নাট-বল্টু দিয়ে মেঝের সাথে আটকানো নেই। শুধু তাই নয়, মূর্তিটা এমন এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা দেখে পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী অসম্ভব মনে হয়!"
পরদিন সকালে সৌম্যক যখন বালিগঞ্জের সেই ধূলিধূসরিত স্টুডিওতে পৌঁছাল, তখন তার সাথে ছিল তার জুনিয়ার অনির্বাণ। স্টুডিওর ঠিক মাঝখানে রাখা ছিল ক্যারারা মার্বেলের তৈরি সেই লাইফ-সাইজ ভাস্কর্য। একটা পুরুষ শরীর, যার কোমর থেকে ওপরের অংশটি একপাশে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে আছে।
অনির্বাণ মূর্তিটার চারপাশে একবার ঘুরে এসে বলল, "ধুর মশাই! এ তো ইতালির পিসার হেলানো মিনার! গ্র্যাভিটির নিয়মে এই মূর্তি তো সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে আছড়ে পড়ার কথা।"
সৌম্যক পকেট থেকে একটা লেজার থ্রেড ও প্লাম্ব-লাইন (ওলন দড়ি) বের করল। মূর্তির মাথা থেকে ওলন দড়িটা ঝোলাতেই দেখা গেল, সেটি মূর্তির দুই পায়ের পাতা দিয়ে তৈরি বেস বা ‘বেস অব সাপোর্ট’-এর অন্তত দশ সেন্টিমিটার বাইরে গিয়ে মাটি ছুঁয়েছে।
"ইম্পসিবল!" সৌম্যক বিড়বিড় করল। "স্ট্যাটিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বস্তুর ভরকেন্দ্র বা Center of Gravity থেকে টানা উল্লম্ব রেখা যদি তার বেসের বাইরে চলে যায়, তবে সেই বস্তু টর্ক (Torque) বা ঘূর্ণন বলের কারণে উল্টে যেতে বাধ্য। এখানে অভিকর্ষজ বল মূর্তির ওপর যে বল প্রয়োগ করছে, তাকে কাউন্টার করার মতো কোনো এক্সটার্নাল ফোর্স নেই। তাও এটা দাঁড়িয়ে আছে কীভাবে?"
সৌম্যক মূর্তির অ্যানাটমি বা হাড়ের গঠনটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কৌশিক মৈত্র শুধু ভাস্কর ছিলেন না, তিনি প্যারিস থেকে হিউম্যান অ্যানাটমি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। মূর্তির প্রতিটি পেশির সংকোচন, প্রতিটি হাড়ের খাঁজ নিখুঁত।
"অনির্বাণ, থ্রি-ডি লেজার স্ক্যানারটা অন করো," সৌম্যক নির্দেশ দিল। "আমাদের এই মূর্তির ভলিউম বা আয়তন এবং তার ভরবণ্টন (Mass Distribution) মাপতে হবে।"
অনির্বাণ ল্যাপটপে স্ক্যানারের ডেটা ইনপুট করতে করতে বলল, "ক্যারারা মার্বেলের ঘনত্ব বা ডেনসিটি হলো ২.৭ গ্রাম/ঘন সেমি। যদি এই মূর্তিটা সম্পূর্ণ সলিড মার্বেলের হয়, তবে এর ওজন হওয়া উচিত প্রায় ১৮০ কেজি। আর এর জ্যামিতিক কেন্দ্র অনুযায়ী ভরকেন্দ্রটি থাকার কথা লুম্বার-৩ (Lumbar-3) বা তৃতীয় কশেরুকার কাছাকাছি। কিন্তু স্ক্যানারের ডেটা বলছে অন্য কথা!"
ল্যাপটপের স্ক্রিনে মূর্তির একটা রঙিন থ্রি-ডি মডেল ভেসে উঠল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মূর্তির বাম দিকের পেলভিস (Pelvis) বা শ্রোণিচক্রের হাড়টি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া এবং ঘন। শুধু তাই নয়, মূর্তির মেরুদণ্ডের লুম্বার অঞ্চলের হাড়গুলোর দৈর্ঘ্য এবং আকৃতিতে এক অদ্ভুত অসঙ্গতি রয়েছে।
অনির্বাণ হাসল, "আমার মনে হয় এর ভেতরে কোনো নিখুঁত মেকানিক্যাল লিভার লজিক আছে, যা বাইরের গ্র্যাভিটিকে ফাঁকি দিচ্ছে।"
"ধাঁধাটা মেকানিক্সে নয় অনির্বাণ, ধাঁধাটা বায়োমেকানিক্সে," সৌম্যক গম্ভীর হয়ে বলল। "মানুষের শরীর যখন এক পায়ে দাঁড়ায় বা একদিকে ঝোঁকে, তখন শরীর উল্টে যায় না কেন? কারণ আমাদের শরীরের ‘কাইনেটিক চেইন’ তখন মেকানিজমটা বদলে দেয়। আমাদের গ্লুটিয়াস মিডিয়াস (Gluteus Medius) পেশি পেলভিসটাকে টেনে ধরে রাখে, যাতে অপর পাশের কোমরটা ঝুলে না পড়ে। কিন্তু এটা তো পাথর! পাথরের তো পেশি নেই। তাহলে কোমর আর মেরুদণ্ডের এই অদ্ভুত বাঁক কেন দেওয়া হলো?"
সৌম্যক ল্যাপটপের স্ক্রিনে হাড়ের মাপগুলো জুম করল। সে দেখল, মূর্তির মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলোর (L1 থেকে L5) ভেতরের কোণগুলো সাধারণ মানুষের মতো নয়। একটা নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত মেনে হাড়গুলোকে সাজানো হয়েছে।
"অনির্বাণ, একটা পেন আর কাগজ দাও তো," সৌম্যক উত্তেজিত হয়ে উঠল। "কৌশিক মৈত্র আমাদের একটা গাণিতিক সংকেত দিয়ে গেছেন। এই হাড়ের কোণগুলোর অনুপাত আসলে একটা ইকুয়েশন!"
সৌম্যক কাগজের ওপর দ্রুত কিছু ইকুয়েশন লিখতে শুরু করল।
"আমরা জানি, টর্কের সূত্র হলো: টর্ক = বল × দূরত্ব × সাইন-থিটা। এখানে বল হলো অভিকর্ষজ বল, আর দূরত্ব হলো ভরকেন্দ্র থেকে ঘূর্ণন অক্ষের দূরত্ব। যেহেতু মূর্তিটা স্থির আছে, তার মানে এর মোট টর্ক শূন্য।"
সৌম্যক মূর্তির প্রতিটি কশেরুকার কোণ ল্যাপটপ থেকে নিয়ে খাতায় বসাল। L1 = ১২°, L2 = ১৫°, L3 = ১৮°, L4 = ২১°।
"খেয়াল করো অনির্বাণ, এই কোণগুলো একটি সমান্তর প্রগতি মেনে চলছে, যার সাধারণ অন্তর বা কমন ডিফারেন্স হলো ৩°। কিন্তু L5-এ এসে কোণটা হঠাৎ করে বদলে হয়ে গেছে ৪৫°! কেন?"
"হয়তো শিল্পী খোদাই করার সময় ভুল করেছিলেন?" অনির্বাণ আন্দাজ করল।
"কৌশিক মৈত্রের মতো জেনিয়াস মানুষের হাত ভুল করবে না, বিশেষ করে তাঁর শেষ সৃষ্টিতে," সৌম্যক মূর্তির ঠিক কোমরের নিচের অংশটায় হাত দিল। "লুম্বার-৫ বা পঞ্চম কশেরুকাটি যেখানে স্যাক্রাম (Sacrum) বা ত্রিকাস্থির সাথে মিশেছে, সেখানে পাথরের ঘনত্ব স্ক্যানারে অনেক বেশি দেখাচ্ছে। মার্বেলের সাধারণ ডেনসিটি ২.৭ হলে, এই নির্দিষ্ট অংশের ঘনত্ব দেখাচ্ছে প্রায় ৭.৫ গ্রাম/ঘন সেমি!"
"তার মানে মূর্তির ভেতরে অন্য কোনো ভারী ধাতু লুকানো আছে!" অনির্বাণ লাফিয়ে উঠল। "লৌহ বা দস্তা! যার ঘনত্ব মার্বেলের চেয়ে অনেক বেশি। সেই ভারী ধাতুর কাউন্টার-ওয়েট বা প্রতিভারসাম্যের জন্যই মূর্তিটা বাইরের দিকে ঝুঁকে থাকলেও উল্টে যাচ্ছে না। স্যার, আমরা লকারের চাবি পেয়ে গেছি! ওই L5 কশেরুকার ভেতরেই চাবিটা কংক্রিট করা আছে।"
"এত তাড়াহুড়ো করো না," সৌম্যক মূর্তির মুখের দিকে তাকাল। মূর্তির মুখে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি খোদাই করা আছে। যেন শিল্পী মৃত্যুর ওপার থেকে তাদের এই ব্যর্থ চেষ্টা দেখছেন। "যদি শুধু একটা কাউন্টার-ওয়েট লুকানোই উদ্দেশ্য হতো, তবে উইলে ওটা লেখার কী দরকার ছিল? আর এই অসম্ভব ভঙ্গিটাই বা কেন তৈরি করলেন? চাবিটা যদি স্রেফ হাড়ের ভেতরেই থাকবে, তবে ‘কোথায় গণিত শেষ হয় আর শিল্প শুরু হয়’ - এই লাইনের মানে কী?"
সৌম্যক আবার মূর্তির পা দুটোর দিকে তাকাল। যে গ্রানাইটের বেদীর ওপর মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে, সেই বেদীর নিচে মেঝের পাথরে কিছু সূক্ষ্ম দাগ কাটা রয়েছে। দাগগুলো গোল গোল, যেন কোনো বড় কম্পাস দিয়ে আঁকা হয়েছে।
"অনির্বাণ, গ্রানাইটের বেদীটার ব্যাসার্ধ মাপো তো," সৌম্যক বলল।
"এক মিটার, স্যার।"
"আর মূর্তির ডান পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে বাম পায়ের গোড়ালির দূরত্ব?"
"ঠিক ৭৩.২ সেন্টিমিটার।"
সৌম্যক মাথা চুলকাল। ৭৩.২ সেন্টিমিটার মানে হলো রুট ৩ × ৪২ এর কাছাকাছি। এই সংখ্যাগুলোর পেছনে কোনো রহস্য আছে। সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। নারায়ণ সান্যালের উপন্যাসের চরিত্র পিকে বাসু যেভাবে জটিল ক্রাইম সিন সমাধান করতেন, ঠিক সেভাবেই সৌম্যক মূর্তির জ্যামিতিক নকশাটাকে মাথার মধ্যে সাজাতে লাগল।
হুট করে তার মনে পড়ে গেল হিউম্যান কাইনেসিওলজির একটি প্রাচীন নিয়ম। মানুষ যখন একদিকে ঝোঁকে, তখন তার ভরকেন্দ্রটি কেবল ডান বা বামে সরে না, সেটি শরীরের অক্ষ বরাবর কিছুটা নিচে নেমে আসে।
"অনির্বাণ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্স-রে স্ক্যানারটা নাও। মূর্তির পেলভিসের ভেতরের অংশটা স্ক্যান করো। আমি দেখতে চাই ভেতরটা ফাঁপা নাকি নিরেট।"
অনির্বাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্স-রে স্ক্যানারটা মূর্তির কোমরের কাছে ধরল। স্ক্রিনে মূর্তির ভেতরের অ্যানাটমির একটা ক্রস-সেকশন ফুটে উঠল। দেখা গেল, মূর্তির বাম দিকের শ্রোণিচক্রের ভেতরে একটা শূন্যস্থান বা ক্যাভিটি রয়েছে। আর সেই ক্যাভিটির ঠিক মাঝখানে একটি ধাতব গোলক ঝুলছে!
"গোলক!" অনির্বাণ অবাক। "একটা পেন্ডুলামের মতো?"
"হ্যাঁ," সৌম্যক উত্তেজিত চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। "কিন্তু এটা সাধারণ পেন্ডুলাম নয়। এটি একটি সিল করা লিকুইড-ড্যাম্পড পেন্ডুলাম। গোলকটির ভেতরে পারদ (Mercury) ভরা আছে। যখনই কেউ এই মূর্তিটাকে নড়ানোর চেষ্টা করবে বা ক্রেন দিয়ে তোলার চেষ্টা করবে, ভেতরের পারদ নড়ে গিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ লক সক্রিয় করবে, আর সেই কারণেই সরকারি আমলারা যখন এটাকে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, মূর্তিটাকে মেঝের সাথে এমনভাবে আটকে দিয়েছিল যে ওটা এক ইঞ্চিও নড়ানো যায়নি!"
"অসাধারণ!" অনির্বাণ বিস্ময়ে নির্বাক। "কৌশিক মৈত্র এক অদ্ভুত মেকানিক্যাল ট্র্যাপ তৈরি করে গেছেন। কিন্তু চাবিটা কোথায়? আর ভরকেন্দ্রের নিখুঁত স্থানাঙ্কটাই বা কী?"
সৌম্যক হাসল। "ভরকেন্দ্র কোথাও স্থির নেই অনির্বাণ। এটাই শিল্পীর আসল খেলা। মূর্তিটা যখন স্থির থাকে, তখন তার এক অবান্তর ভরকেন্দ্র দেখায়। কিন্তু যখনই তুমি এর মেরুদণ্ডের লুম্বার-৫ কশেরুকায় একটি নির্দিষ্ট বল বা প্রেসার দেবে, তখন ভেতরের মেকানিজমটা আনলক হয়ে যাবে।"
"নির্দিষ্ট বল? তার পরিমাণ কত?"
"সেটাই তো ওই ইকুয়েশনে লুকিয়ে ছিল। L1 থেকে L4 এর কোণগুলোর সমষ্টি হলো ১২ + ১৫ + ১৮ + ২১ = ৬৬°। আর L5 হলো ৪৫°। এই দুটোর পার্থক্য হলো ২১। কৌশিকবাবুর স্টুডিও নোটে যে ক্যালিব্রেশন লেখা ছিল, সেই অনুযায়ী ওই পয়েন্টে ২১ নিউটন বল প্রয়োগ করলেই ল্যাচ খুলবে।"
সৌম্যক পকেট থেকে একটি ডিজিটাল ফোর্স-গেজ বের করল। সেটি মূর্তির লুম্বার-৫ কশেরুকার ওপর স্থাপন করে সে আলতো করে চাপ দিতে লাগল।
ফোর্স-গেজের রিডিং উঠতে লাগল: ১০ নিউটন... ১৫ নিউটন... ২০ নিউটন... আর ঠিক যখনই রিডিং ২১ নিউটনে পৌঁছাল, মূর্তির ভেতর থেকে একটি সূক্ষ্ম ধাতব ‘ক্লিক’ শব্দ শোনা গেল।
সাথে সাথে, মূর্তির সেই বিপজ্জনক হেলানো ভঙ্গিটা এক ইঞ্চি সোজা হয়ে গেল! ওলন দড়িটা লহমায় সরে এসে মূর্তির দুই পায়ের ঠিক মাঝখানে স্থির হলো। যে ভাস্কর্য এতক্ষণ পদার্থবিদ্যার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছিল, তা এখন এক্কেবারে সাধারণ, ভারসাম্যযুক্ত একটি মূর্তিতে পরিণত হলো।
একই সাথে, মূর্তির ডান হাতের পাথরের আঙুলগুলো, যা এতক্ষণ শক্ত মুঠো হয়ে বন্ধ ছিল, তা আস্তে করে খুলে গেল। সেই পাথরের হাতের তালুর ওপর রাখা ছিল একটি প্রাচীন ব্রোঞ্জের চাবি। চাবির গায়ে খোদাই করা স্টেট ব্যাঙ্কের লকার নম্বর।
"উই ডিড ইট, স্যার!" অনির্বাণ আনন্দে চিৎকার করে উঠল। "আমরা ধাঁধাটার সমাধান করে ফেলেছি! বিজ্ঞান আর গণিতের সাহায্যে আমরা মূর্তির আসল ভরকেন্দ্রটা খুঁজে বের করেছি।"
সৌম্যক চাবিটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু তার মুখে কোনো আনন্দের চিহ্ন ছিল না। সে মূর্তির মুখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"কী হলো স্যার? চাবি তো পেয়ে গেছেন, এবার লকার খোলার ব্যবস্থা করি?" অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
"অনির্বাণ, তুমি কি বুঝতে পারছ কৌশিক মৈত্র আমাদের সাথে কী খেলাটা খেললেন?" সৌম্যক ধীর গলায় বলল। "তিনি উইলে লিখেছিলেন - যে মূর্তির স্থায়িত্বের রহস্য আর নিখুঁত ভরকেন্দ্র খুঁজে পাবে, লকারের চাবি তার হবে। আমরা ভাবলাম আমরা বিজ্ঞান দিয়ে ধাঁধাটা জিতলাম। কিন্তু একটু ভালো করে দেখো..."
সৌম্যক মূর্তির পায়ের বেদীর দিকে আঙুল নির্দেশ করল।
যে মুহূর্তে মূর্তির ভেতরের পেন্ডুলামটা আনলক হয়েছে এবং মূর্তিটি সোজা হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তার বাম পায়ের মার্বেলের গোড়ালিতে একটি সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিয়েছে। ভারসাম্য সোজা হওয়ার কারণে মূর্তির নিজস্ব ওজনের পুরো লোডটা এখন স্থানান্তরিত হয়েছে তার দুর্বল পায়ের পাতার ওপর।
"এই মূর্তিটা এতক্ষণ টিকে ছিল কারণ ওটা বাঁকা ছিল," সৌম্যক বিষণ্ণ গলায় বলল। "প্রকৃতির নিয়মকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যই ওটার ভেতরের স্ট্রেস বা চাপটা সমানভাবে বণ্টিত হয়েছিল। আমরা আমাদের অহংকারী বিজ্ঞান আর লজিক দিয়ে ওটাকে সোজা করলাম, ওটার তথাকথিত ‘নিখুঁত ভরকেন্দ্র’ ফিরিয়ে আনলাম। আর তার পরিণতি কী হলো?"
সৌম্যকের কথা শেষ হওয়ার আগেই, এক তীব্র মড়মড় শব্দে স্টুডিওর বাতাস কেঁপে উঠল। চোখের পলকে, শতকোটি টাকার সেই অমূল্য মার্বেল ভাস্কর্য ‘স্থিতাবস্থা’ নিজের ওজনের ভার সহ্য করতে না পেরে মাঝখান থেকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল।
ধুলোর মেঘ শান্ত হলে দেখা গেল, মেঝের ওপর পড়ে আছে কেবল ভাঙা পাথরের স্তূপ। আর সেই ধ্বংসাবশেষের মাঝখান থেকে কৌশিক মৈত্রের খোদাই করা সেই মুখের অংশটি অক্ষত অবস্থায় তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
শিল্পী উইলে লিখেছিলেন: "গণিত যেখানে শেষ হয়, শিল্প সেখানে খেলা শুরু করে।"
সৌম্যক বুঝতে পারল, চাবিটা তাঁরা পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জেনিয়াস শিল্পীর কাছে বিজ্ঞানের অহংকারটা চরমভাবে হেরে গেছে। কৌশিক মৈত্র জানতেন, কোনো এক আধুনিক লজিশিয়ান ঠিকই তাঁর মেকানিজম ধরে ফেলবে। আর সেই মেকানিজম সমাধান করার একমাত্র শাস্তি হলো - নিজের হাতে সেই অনন্য শিল্পকলাকে ধ্বংস করা।
বাকিটা কেবলই শব্দের জাদুকরি ভেলকি, আর মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা মার্বেলের কান্না!